
ফুটবল বিশ্বকাপের শীর্ষ ১৪ থিম সং
আর মাত্র দুই দিন, এরপরই পর্দা উঠছে মাঠের লড়াইয়ের। গ্যালারিভর্তি গর্জন আর বিশ্বসেরাদের পায়ের জাদুতে বুঁদ হতে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব। তবে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের আনন্দ মাঠের বাইরেও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় বিশ্বকাপের থিম সং। সুর আর ফুটবলের এই মেলবন্ধন চিরকালের। একটি দুর্দান্ত বিশ্বকাপ গান কেবল টুর্নামেন্টের আবহ তৈরি করে না, বরং যুগের পর যুগ কোটি ফুটবলপ্রেমীর স্মৃতির মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকে।
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চ কাঁপানো থিম সং গুলোর তালিকায় রয়েছে;
আনয়েস্তাতে ইতালিয়ানো (১৯৯০)
এদোয়ার্দো বেনেট্টো ও জিয়ান্না ন্যান্নিনির গাওয়া ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের এই গানের ভিডিও এখনো বেশ জনপ্রিয়। নব্বই দশকের ফুটবল উত্তেজনার রেশ পাওয়া যায় গানটিতে। ইতালীয় ও ইংরেজি ভাষায় লেখা এই গানটিতে বিশ্বকাপ সংগীতের প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই আছে—উদ্দীপনাময় সুর আর আবেগঘন কণ্ঠ। গানের ইতালীয় সংস্করণটি দেশটির চার্টে এক নম্বরে উঠেছিল। পাশাপাশি এর স্প্যানিশ ও ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশ করা হয়।
গ্লোরি ল্যান্ড (১৯৯৪)
একটি ঐতিহ্যবাহী সংগীতের আবহে তৈরি করা হয়েছিল ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল বিশ্বকাপের এই গান। গানটি লেখেন এবং সুরারোপ করেন ড্যারিয়েল হল, আর সাথে ছিল সাউন্ডস অব ব্ল্যাকনেস। গানটির যন্ত্রসংগীত নিয়ে কিছুটা সমালোচনা হলেও ড্যারিয়েল হলের কণ্ঠের জোর গানটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গানটি এখনো শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তোলে।
দ্য কাপ অব লাইফ (১৯৯৮)
পপ তারকা রিকি মার্টিনের গাওয়া ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের এই গানটি ফুটবল সংগীতের ধারাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ‘লা কোপা দে লা ভিদা’ বা ‘দ্য কাপ অব লাইফ’ গানটির ছন্দ ও উদ্দীপনা ফুটবলার এবং দর্শক সবাইকে সমানভাবে উজ্জীবিত করেছিল, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের প্লে-লিস্টের শীর্ষে রাজত্ব করছে।
বুম (২০০২)
‘বুম’ গানটি ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ছিল, যা গেয়েছিলেন আনাস্তাসিয়া। এটি একটি মাঝারি গতির উৎসাহমূলক গান, যেখানে সাফল্য, কঠোর পরিশ্রম আর স্বপ্ন পূরণের মতো সাধারণ কথা বলা হয়েছে। গানের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল এর মিউজিক ভিডিওটি। সেখানে কিছু সাধারণ মানুষকে হঠাৎ ভিনগ্রহের প্রাণীরা তুলে নিয়ে যায়—এটাই ছিল ভিডিওটির মজার ও অদ্ভুত অংশ। গানটি সে সময় খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও ইউরোপের কিছু দেশের সংগীত তালিকায় ভালো জায়গা পেয়েছিল।
দ্য টাইম অব আওয়ার লাইভস (২০০৬)
২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপের এই অফিশিয়াল গানটি গেয়েছিলেন বিখ্যাত ব্যান্ড ‘ইল ডিভো’ এবং পপ গায়িকা টনি ব্র্যাক্সটন। বিশ্বকাপের অন্যান্য উৎসবমুখর ও নাচ-গানের চেয়ে এই সুরটি ছিল কিছুটা ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল ঘরানার, যা বিশ্বকাপের মঞ্চে বিজয়ের গৌরব ও আবেগকে দারুণভাবে স্পর্শ করেছিল।
ওয়াকা ওয়াকা (২০১০)
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের এই অফিশিয়াল গানটি গেয়েছিলেন কলম্বিয়ান পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা। ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’ গানটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল থিম সং হিসেবে বিবেচিত। এর আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী ছন্দ ও সুর আজও বিশ্বজুড়ে যেকোনো ফুটবল উৎসবে নতুন করে শিহরণ জাগায়।
ওয়েভিং ফ্ল্যাগ (২০১০)
সোমালি-কানাডিয়ান শিল্পী কে’নানের গাওয়া ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’ গানটি ২০১০ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান না হলেও, এটি বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি করেছিল। একটি কোমল সুরের মাধ্যমে শুরু হয়ে গানটি যেভাবে আস্তে আস্তে উদযাপনের রঙে রূপ নেয়, তা ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক গভীর ভালো লাগার জন্ম দেয়।
উই আর ওয়ান (২০১৪)
ব্রাজিল বিশ্বকাপের (২০১৪) অফিশিয়াল থিম সং ‘উই আর ওয়ান (ওলে ওলা)’ গেয়েছিলেন পিটবুল, জেনিফার লোপেজ এবং ব্রাজিলিয়ান শিল্পী ক্লডিয়া লেইতে। ব্রাজিলের চিরচেনা সাম্বা নৃত্য এবং ফুটবলীয় সংস্কৃতির এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল এই এনার্জেটিক ট্র্যাকে।
লা লা লা (২০১৪)
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপেই শাকিরা এবং কার্লিনহোস ব্রাউনের যৌথ প্রয়াসে মুক্তি পায় ‘লা লা লা’। গানটির ভিডিওতে লিওনেল মেসি, নেইমার, জেরার্ড পিকের মতো বিশ্বসেরা ফুটবলারদের উপস্থিতি এবং এর চমৎকার ড্রাম বিট গানটিকে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় গান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
লাইভ ইট আপ (২০১৮)
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘লাইভ ইট আপ’ পরিবেশন করেছিলেন নিকি জ্যাম, উইল স্মিথ ও ইরা ইস্ত্রেফি, যার প্রযোজনা করেছিলেন ডিপলো। ফুটবলের উৎসবমুখর পরিবেশ এবং বৈশ্বিক ঐক্যকে ধারণ করে তৈরি হয়েছিল এই চমৎকার গানটি।
কালারস (২০১৮)
জেসন ডেরুলোর গাওয়া ‘কালারস’ গানটি ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য কোকা-কোলার অফিশিয়াল থিম সং ছিল। গানটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৈচিত্র্য এবং পতাকার রঙকে উদযাপনের মাধ্যমে ফুটবলের সর্বজনীন রূপটি ফুটিয়ে তোলা হয়।
ড্রিমার্স (২০২২)
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের এই অফিশিয়াল গানটি গেয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত বয়ব্যান্ড বিটিএস (BTS)-এর তারকা জংকুক এবং কাতারি শিল্পী ফাহাদ আল কুবাইসি। আধুনিক পপ ঘরানার এই গানটিতে স্বপ্নকে জয় করার এক অসাধারণ বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুতই বিশ্বসংগীতের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে নেয়।
হায়্যা হায়্যা (২০২২)
কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম অফিশিয়াল গান ছিল ‘হায়্যা হায়্যা (বেটার টুগেদার)’। ট্রিনিদাদ কার্ডোনা, ডেভিডো এবং আয়েশার কণ্ঠে এই গানটিতে আরব্য সংস্কৃতির সুরের সঙ্গে আধুনিক পপ ও রেগের এক দারুণ ফিউশন ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, যা বিশ্ববাসীকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানায়।
ডাই ডাই (২০২৬)
মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বসছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আসর। এই আসরকে সামনে রেখে গত ১৫ মে প্রকাশিত হয়েছে গানটি। এটি গেয়েছেন কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বার্না বয়। তবে গানটি শাকিরার বিখ্যাত ‘ওয়াকা ওয়াকা’র ধারেকাছেও যেতে পারেনি, অনেকটাই ম্লান।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম ইউএসপিএন লিখেছে, গানটি কিছুটা একঘেয়ে হলেও এর মধ্যে উচ্ছ্বাসের আবহ রয়েছে। এই গ্রীষ্মে উত্তর আমেরিকার গ্যালারিতে এটি সমস্বরে গাওয়া হবে এমনটা কল্পনা করা কঠিন হলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে গানের তালিকায় এটি পড়ে না।
ফুটবল আসে, ফুটবল যায়। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্ব মেতে ওঠে নতুন কোনো দেশে, নতুন কোনো উন্মাদনায়। তবে টুর্নামেন্টের মাঠের লড়াই একসময় শেষ হয়ে গেলেও এই সুরগুলো কখনো হারিয়ে যায় না। শাকিরা, রিকি মার্টিন কিংবা জংকুকের কণ্ঠের এই গানগুলো ফুটবলারদের লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে এবং কোটি ভক্তের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে অনন্তকাল।
ভিজুয়াল স্টোরি











































