মঙ্গলবার । জুন ৯, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক বিনোদন ৯ জুন ২০২৬, ১:১৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

সাইফের অভিনয়ে অনবদ্য এক ক্রাইম থ্রিলার ‘কর্তব্য’


Saif Ali Khan

সাইফ আলী খান

চল্লিশে পা রাখা পবন (সাইফ আলী খান) ঝামলি নামক এক মফস্বল থানার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত। সিনেমার শুরুতেই তার কাঁধে ন্যস্ত হয় এক নারী সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ। সেই সাংবাদিক মূলত শহরের প্রভাবশালী ধর্মগুরু আনন্দ শ্রীর (সৌরভ দ্বিবেদী) আড়ালে চলা শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ অপরাধের প্রমাণ জোগাড় করতে এসেছিলেন। কিন্তু পবনের চোখের সামনেই সেই সাংবাদিক আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান এবং পবনের বিশ্বস্ত সহকর্মী অশোক (সঞ্জয় মিশ্র) গুরুতর আহত হন।

এই ঘটনার আকস্মিকতায় পবনের পেশাগত জীবন সংকটে পড়ে; ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে বরখাস্ত করতে চাইলে নিজের সততা প্রমাণের জন্য সে মাত্র এক সপ্তাহের সময় চেয়ে নেয়। এর মধ্যেই ব্যক্তিগত স্তরে আরেকটি বিপর্যয় নেমে আসে—তার ছোট ভাই আচমকা নিখোঁজ হয়, যার পেছনে অনগ্রসর জাতের এক তরুণীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে।

এই দুই সমান্তরাল সংকটের তদন্ত করতে গিয়ে পবনের ভেতরের ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হয়। যে সত্য প্রকাশের দায় একজন সাংবাদিকের ছিল, পরিস্থিতির শিকারে সেই গুরুভার এসে পড়ে এই পুলিশ কর্মকর্তার কাঁধে। পবনের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরণের পেছনে তার স্ত্রী বর্ষার (রসিকা দুগ্গল) সাথে কথোপকথন গভীর ভূমিকা রাখে। পবন বুঝতে পারে, অন্যায় দেখেও চুপ থাকা বা চোখ বন্ধ করে রাখার মধ্য দিয়েই আসলে সাধারণ মানুষেরা নিজেদের অজান্তে সমাজকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেয়।

পরিচালক পুলকিতের আগের কাজ, শাহরুখ খানের রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে নির্মিত নেটফ্লিক্স চলচ্চিত্র ‘ভক্ষক’–এর সাথে এই সিনেমার একটি গভীর আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে। ‘ভক্ষক’ ছবিতে ভূমি পেড়নেকর এক অকুতোভয় সাংবাদিকের ভূমিকায় আশ্রয়কেন্দ্রের নারী ও শিশুদের ওপর হওয়া নির্যাতন চক্রের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন।

‘কর্তব্য’ যেন সেই একই বাস্তবতার অপর পিঠ, যেখানে শুরুতেই সত্যের অনুসন্ধানী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় এবং একজন পুলিশকে সেই অসম লড়াইয়ের হাল ধরতে হয়। দুই ছবির আবহেই রাতের অন্ধকারকে এক জীবন্ত চরিত্রের মতো ব্যবহার করা হয়েছে, আর দুটিতেই সঞ্জয় মিশ্রকে দেখা গেছে এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার ভূমিকায়।

হিন্দি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে সাধারণত ‘কর্তব্য’ বা দায়িত্ববোধ শব্দটিকে প্রতিশোধ কিংবা বংশের মর্যাদা রক্ষার সমার্থক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু এই ছবিতে পবন লড়াই করে সমাজপতিদের রক্ষণশীলতা, কট্টর পিতৃতন্ত্র ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে। কট্টরপন্থী বাবার (জাকির হুসেন) তৈরি করা প্রাচীন নিয়মের বেড়াজাল থেকে নিজের ছোট ভাইকে মুক্ত করতে হয় তাকে।

ছবিতে পবনের সাদা স্নিকার্স পরার অভ্যাস যেন ‘রাব নে বানা দে জোড়ি’র শাহরুখ খানের এক মধ্যবয়সী, বাস্তবসম্মত প্রতিচ্ছবি—যে নিজের সীমাবদ্ধতার মাঝেও সমাজকে বদলাতে চায়। নিজের সন্তান যখন পঞ্চায়েতের বৈঠক থেকে শেখা নোংরা ভাষা ব্যবহার করে, তখন পবনের উপলব্ধি আরও তীব্র হয় যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্য এই বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তন জরুরি।

Saif Ali Khan movie

‘কর্তব্য’- এর দৃশ্য

পরিচালক এই ছবিতে অন্ধ ধর্মভীতির সমালোচনা করলেও আধ্যাত্মিকতাকে পুরোপুরি বর্জন করেননি। পবন একজন খাঁটি শিবভক্ত, অথচ ছবির এক বিশ্বাসঘাতক চরিত্র নাস্তিক। সিনেমাটি দেখায় যে ক্ষমতার লোভ কীভাবে ধর্মকে হাতিয়ার বানায়, অথচ প্রকৃত ধর্মের মূল কথা হলো মানবতা।

ওটিটি ধাঁচের ভয়েসওভার বা কিছু অতিরিক্ত সংলাপের ব্যবহার থাকলেও, চিত্রনাট্যের সূক্ষ্মতা ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক ছবিটিকে উপভোগ্য করেছে। ভাইয়ের প্রেমের প্রসঙ্গে পবনের মুখে ‘নিজেকে শাহরুখ খান ভাবা’র সংলাপ কিংবা বাবার সাথে অমরিশ পুরির তুলনা—প্রযোজক সংস্থাকে নিয়ে এক দারুণ আত্মবিদ্রূপের সৃষ্টি করে।

অভিনয়ের দিক থেকে রুক্ষ উত্তর ভারতীয় চরিত্রে সাইফ আলী খান আবারো অনবদ্য। ‘ওমকারা’র ল্যাংড়া ত্যাগী কিংবা ‘স্যাক্রেড গেমস’–এর সারতাজ সিংয়ের পর এখানেও তার ভেতরের অস্থিরতা ও পিতৃত্বের আকুলতা ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। তার এই রূপটি অ্যামাজন প্রাইমের ‘সুবেদার’ ছবিতে অনিল কাপুরের লড়াকু চরিত্রের কথা মনে করালেও, সাইফের পবন বিশ্বাস করে—প্রকৃতপক্ষে বাঁচতে হলে আগে কিছুটা মরতে জানতে হয়।

পার্শ্ব চরিত্রে যুধবীর আহালওয়াত ‘হরপাল’ চরিত্রে ভয় ও মানসিক ভাঙনের এক দুর্দান্ত রূপদান করেছেন। মনীশ চৌধুরী নৈতিকভাবে দোদুল্যমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চরিত্রে এবং সঞ্জয় মিশ্র চিরচেনা বিশ্বস্ততায় দারুণ অভিনয় করেছেন। তবে সিনেমার সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো ভণ্ড ধর্মগুরুর চরিত্রে সাংবাদিক সৌরভ দ্বিবেদীর কাস্টিং। হাত নেড়ে সংলাপ বলা ছাড়া তার অভিনয়ে গভীরতার অভাব ছিল স্পষ্ট, যার কারণে পরিচালক অনেক দৃশ্যে তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া এই খল চরিত্রটির অপরাধের পেছনের মনস্তত্ত্ব ও উদ্দেশ্যকে চিত্রনাট্যে বিস্তারিতভাবে মেলে ধরা হয়নি।

ঝামলি নামক এক কাল্পনিক অথচ চিরচেনা ভয়ার্ত শহরের গল্প নিয়ে ‘কর্তব্য’ সুধীর মিশ্র বা অনুরাগ কাশ্যপের রাজনৈতিক ঘরানার সিনেমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে দর্শক শুরু থেকেই অপরাধীর পরিচয় জানে, তাই এটি কেবল একটি খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের গল্প নয়; বরং অপরাধের নেপথ্যে থাকা বন্দুকের মালিকদের আড়াল করার সমাজব্যবস্থার এক প্রতিচ্ছবি। সাইফ আলী খানের শক্তিশালী অভিনয় এবং পরিচালকের সৎ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, একটি দুর্বল ও অগভীর খল চরিত্রের কারণে সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত বেশ ভালো একটি সৃষ্টি হয়েই থেকে যায়, অসাধারণ বা ‘ওয়াও’ হয়ে উঠতে পারে না।