
মমতা ব্যানার্জী
ভারতের অন্যতম সফল নারী রাজনীতিক ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ক্ষমতা হারানোর মাত্র এক মাসের মধ্যেই বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। দলের ভেতরে বিদ্রোহ, বিধায়ক এবং সংসদ সদস্যদের সম্ভাব্য দলত্যাগ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজ্যে ক্ষমতায় আসে। এর মধ্য দিয়ে টিএমসির টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
তবে নির্বাচনে পরাজিত হলেও টিএমসি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। দলটি প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ভোট পেয়েছে, যা বিজেপির চেয়ে মাত্র ৩০ লাখ কম। এছাড়া প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে দলটি। বর্তমানে রাজ্য বিধানসভায় দলটির ৮০ জন সদস্য এবং জাতীয় সংসদে ২৮ জন সদস্য রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন ফলাফল নিয়ে সাধারণত একটি দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। কিন্তু টিএমসির ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টোটা।
নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বিদ্রোহী নেতারা দলের আইনসভা শাখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের মধ্য থেকে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত করেন। তারা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নথিতে জাল স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন।
রাজ্য রাজনীতির এই সংকট পরে দিল্লিতেও ছড়িয়ে পড়ে। খবর অনুযায়ী, টিএমসির ২৮ জন সাংসদের মধ্যে প্রায় ২০ জন দলীয় সংসদীয় গ্রুপ থেকে বেরিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে আবেদন করেছেন।
যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু বিদ্রোহ নয়, বরং টিএমসির অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
জুনের শুরুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি জনসভায় মাত্র কয়েকশ মানুষ উপস্থিত হন। একসময় তার সভায় লাখো মানুষের সমাগম হতো। অনেকের মতে, এটিই দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক।
দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিধানসভার একটি আসনে, যেখানে ২০২১ সালে টিএমসি ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, সেখানে পুনর্নির্বাচনে দলটি নিজের প্রার্থীকেই ধরে রাখতে পারেনি। তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
এদিকে প্রায় প্রতিদিনই টিএমসির নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর আসছে। অনেক দলীয় কার্যালয় কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে এবং একসময় প্রভাবশালী নেতারাও নিজ নিজ এলাকায় জনরোষের মুখে পড়ছেন। যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রায় নজিরবিহীন।
বিশ্লেষকদের মতে, টিএমসির মূল শক্তি ছিল দুটি বিষয়—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ক্ষমতায় থাকার সুবিধা। কিন্তু এখন দুটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কলকাতায় মমতার ব্যক্তিগত নির্বাচনী পরাজয় তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে স্থানীয় নেতাদের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং দল ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির উত্থানও এই পরিস্থিতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। আগে দলত্যাগ সাধারণত ব্যক্তি পর্যায়ে হতো। এখন পুরো একটি গোষ্ঠী বিদ্রোহ করার সুযোগ পাচ্ছে, কারণ বিজেপি বিকল্প ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
তাদের মতে, ভারতের অনেক আঞ্চলিক দল ধীরে ধীরে পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠাতার নেতৃত্ব মেনে নিলেও উত্তরাধিকার পরিবারের অন্য সদস্যের হাতে গেলে অনেক নেতা তা মেনে নিতে চান না। টিএমসির বর্তমান সংকট সেই বৃহত্তর প্রবণতারই অংশ।
তবে ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বিজেপির নির্বাচনী বিজয়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং দাবি করেছেন, প্রায় ১০০টি আসন তাদের কাছ থেকে ‘ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে’।
দলীয় বিদ্রোহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করার পর এখন ক্ষমতা হারাতেই কিছু মানুষ অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলেছে।’ তবে তিনি আশাবাদী যে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
মমতা বলেন, ‘আমরা নতুন করে দল গড়ে তুলব। টিএমসি শুধু নেতাদের দল নয়, এটি কর্মীদের দল।’
বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। অতীতে তিনি বহুবার প্রতিকূলতা জয় করেছেন। কিন্তু একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা আর নিজের দলের ভেতরকার ভাঙন সামলে নতুন করে দল গড়ে তোলা—দুটি এক বিষয় নয়।
তাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতার প্রত্যাবর্তন এখনো সম্ভব হলেও, তার জন্য শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, দলের নেতৃত্ব ও কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলা টেলিগ্রাফ পর্যবেক্ষণ