
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে রেকর্ড ১,২৪৮ জন খেলোয়াড় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদিও তাদের মধ্যে একেবারে অপরিচিত মুখ খুব কমই আছে, তবু ৮৯১ জন খেলোয়াড় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলবেন। ফলে অনেক নতুন মুখের জন্য এটি হবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচিত করে তোলার বড় সুযোগ।
বিবিসি স্পোর্টসের টিভি ও রেডিও বিশ্বকাপ ধারাভাষ্যকাররা ২০ জন ফুটবলারের নাম বেছে নিয়েছেন, যাদের দিকে এবারের বিশ্বকাপে বিশেষ নজর রাখা উচিত।
১. ইয়ান ডিওমান্দে (আইভরি কোস্ট)

বয়স: ১৯
পজিশন: উইঙ্গার
ক্লাব: আরবি লাইপজিগ
ডিওমান্দেকে নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ, প্যারিস সেন্ট জার্মেইন ও বায়ার্ন মিউনিখ। তবে ডিওমান্দের দল লাইপজিগ জানিয়েছে, তিনি বিক্রির জন্য নন এবং তার মূল্য ১৩০ মিলিয়ন ইউরোর (১১২ মিলিয়ন পাউন্ড) বেশি।
ধারাভাষ্যকার স্টিভ উইলসনের মতে, গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ফুটবলারদের একজন হতে পারেন ডিওমান্দে। গত জুলাইয়ে স্প্যানিশ ক্লাব লেগানেস থেকে মাত্র ২ কোটি ইউরোতে লাইপজিগে যোগ দিয়ে তিনি ৩৩টি বুন্দেসলিগা ম্যাচে ১২ গোল ও ৯ অ্যাসিস্টসহ মোট ২১টি গোল অবদান রাখেন। তার পারফরম্যান্সে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা পায় লাইপজিগ।
তিনি বুন্দেসলিগার ‘রুকি অব দ্য সিজন’ পুরস্কারও জিতেছেন। ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর ফ্লোরিডায় তিন বছর ছিলেন, ফলে বিশ্বকাপের পরিবেশ তার জন্য পরিচিত হবে। কাঁধের চোটে মার্চের প্রীতি ম্যাচগুলো মিস করলেও ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে জয়ী দলের সদস্য ছিলেন।
২. গিলবার্তো মোরা (মেক্সিকো)

বয়স: ১৭
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: তিহুয়ানা
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম তাকে ‘মেক্সিকান পেদ্রি’, ‘মেক্সিকান পার্ল’ এবং ‘ক্রাকিতো’ (ছোট জাদুকর) নামে ডাকতে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর।
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে কম বয়সী ১৭ বছরের এই খেলোয়াড় আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার। গত গ্রীষ্মে গোল্ড কাপে ১৬ বছর বয়সে মেক্সিকোর সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন।
কোচ তাকে ফাইনালেও খেলান, যেখানে মেক্সিকো ২-১ গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে হারায়।
লিগা এমএক্স ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতা মোরা। ২০২৪ সালের আগস্টে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিহুয়ানার হয়ে গোল করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে তার ওপর থাকবে স্বাগতিকদের অনেক আশা।
৩. জোহান মানজাম্বি (সুইজারল্যান্ড)

বয়স: ২০
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: ফ্রাইবুর্গ
ছোটবেলায় মানজাম্বি হতে চেয়েছিলেন গোলরক্ষক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হননি। মিডফিল্ডের একাধিক পজিশনে খেলতে পারেন, আবার আক্রমণভাগেও কার্যকর। বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ।
সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই তরুণ খেলোয়াড়দের বড় মঞ্চে তুলে ধরতে সফল। আগে যেমন ব্রিল এমবোলো বা ড্যান এনডয়ের উত্থান হয়েছিল, এবার মানজাম্বির পালা হতে পারে।
তিনি ইউরোপা লিগের ফাইনালে ওঠা ফ্রাইবুর্গ দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিনের মতেন, গোল করার জন্য তার যে ক্ষুধা, তা খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা যায়।
গত মৌসুমে ইউরোপা লিগে সাত গোল করেন এবং টুর্নামেন্টের ‘রেভেলেশন অব দ্য সিজন’ নির্বাচিত হন। ন্যাশভিলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪-০ জয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোলও করেন।
৪. রিকার্ডো পেপি (যুক্তরাষ্ট্র)

বয়স: ২৩
পজিশন: স্ট্রাইকার
ক্লাব: পিএসভি আইন্দহোভেন
পেপি তার গোল উদযাপনের জন্য পরিচিত, যা জাপানি অ্যানিমে সিরিজ ‘নারুতো’র একটি চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত।
বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো খুব বেশি দূর যাবেনা, তবে পেপি হতে পারেন দলটির উজ্জ্বল নক্ষত্র। ডাচ লিগে শিরোপাজয়ী পিএসভির হয়ে গত মৌসুমে ১৯ গোল করেছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়েও ৩৫ ম্যাচে ১৩ গোল রয়েছে তার।
৫. নিকো পাজ (আর্জেন্টিনা)

বয়স: ২১
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: কোমো
বাঁ-পায়ের খেলোয়াড় এবং তার সঙ্গে প্রায়ই মেসির তুলনা করা হয়। ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর সাফল্যে বড় ভূমিকা ছিল তার।
তিনি গোল করেন, গোল বানান এবং দারুণ প্রেসিং করেন। জাতীয় দলে কতটা সুযোগ পাবেন, তা নির্ভর করবে আর্জেন্টাইন কোচ স্কোলানির পরিকল্পনার ওপর। তবে সুযোগ পেলে তিনি তা কাজে লাগাতে পারবেন বলেই ধারণা।
গত মৌসুমে সিরি আ-তে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করেন এবং ১৩ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেন নিকো পাজ।
৬. গেসিম ইয়াসিন (মরক্কো)

বয়স: ২০
পজিশন: রাইট উইঙ্গার
ক্লাব: স্ট্রাসবুর্গ
বার্সেলোনা ও চেলসির নজরে থাকা মরক্কোর গেসিম ইয়াসিন হতে পারেন এবারের বিশ্বকাপের বড় তারকা।
মরক্কো কোচ মোহাম্মদ ওউহাবির অধীনে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মার্চে ইকুয়েডরের বিপক্ষে অভিষেকের পর থেকে তিনি নিয়মিত জাতীয় দলে ডাক পাচ্ছেন।
৭. লুকাস হেরিংটন (অস্ট্রেলিয়া)

বয়স: ১৮
পজিশন: সেন্টার-ব্যাক
ক্লাব: কলোরাডো র্যাপিডস
এই তরুণ অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্ডার ব্রিসবেনে জন্মগ্রহণ করেন এবং জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেন ক্লাব রেকর্ড ফিতে। মেজর লিগ সকারে ভালো পারফরম্যান্সের কারণে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন।
তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী বিশ্বকাপ স্কোয়াড সদস্যদের একজন।
৮. কেরিম আলাজবেগোভিচ (বসনিয়া-হার্জেগোভিনা)

বয়স: ১৮
পজিশন: উইঙ্গার
ক্লাব: রেড বুল সালজবুর্গ
যদিও জাতীয় দলে তিনি এখনো নিয়মিত শুরুর একাদশে নেই, তবে তাকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ তিনি বড় ম্যাচে চাপ সামলাতে জানেন—ওয়েলস ও ইতালির বিপক্ষে প্লে-অফে টাইব্রেকারে গোল করেছেন।
৯. কেরিম উজুন (তুরস্ক)

বয়স: ২০
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট
জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই প্লেমেকার তুরস্কের হয়ে খেলছেন। নুরেমবার্গে থাকাকালীন তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টে যোগ দেওয়ার পর তিনি শুরুতেই পাঁচ ম্যাচে ৫ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করেন।
ইনজুরির কারণে তার অগ্রগতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও তাকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
১০. আর্মান্দো গঞ্জালেস (মেক্সিকো)

বয়স: ২৩
পজিশন: স্ট্রাইকার
ক্লাব: চিভাস দে গুয়াদালাহারা
গঞ্জালেস গত মৌসুমে ২৫ গোল করেছেন এবং জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছেন। তাকে অনেকেই মেক্সিকোর কিংবদন্তি জাভিয়ার হার্নান্দেজের সঙ্গে তুলনা করেন।
তিনি জাতীয় দলের হয়ে এখনো বেশি গোল না করলেও ‘সুপার সাব’ হিসেবে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
১১. আয়্যুব বৌয়াদি (মরক্কো)

বয়স: ১৮
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: লিল
ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেললেও তিনি পরে তার দেশ মরক্কোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। ১৬ বছর বয়সেই লিলের হয়ে ইউরোপা কনফারেন্স লিগে তার অভিষেক হয়।
তার খেলায় বুদ্ধিমত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অসাধারণ, বিশেষ করে ডিপ মিডফিল্ড পজিশনে।
১২. হুসেম আউয়ার (আলজেরিয়া)

বয়স: ২৭
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: আল-ইত্তিহাদ
ফ্রান্স জাতীয় দলে এক ম্যাচ খেললেও পরে আলজেরিয়ার হয়ে খেলছেন। সৌদি লিগে ১৫ গোল করে তিনি নিজের হারানো ফর্ম ফিরে পেয়েছেন।
১৩. আলেসান্দ্রো সিরকাতি (অস্ট্রেলিয়া)

বয়স: ২২
পজিশন: সেন্টার-ব্যাক
ক্লাব: পারমা
ইতালিতে জন্ম নেওয়া এই ডিফেন্ডার ছোটবেলায় অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। তিনি পারমার রক্ষণভাগে নিয়মিত খেলছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে তাকে।
১৪. আলী জাসিম (ইরাক)

বয়স: ২২
পজিশন: লেফট উইঙ্গার
ক্লাব: কোমো (বর্তমানে আল-নাজমা লোনে)
মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি ইরাকি লিগে খেলা শুরু করেন। অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি। ইরাকের কোচ নিয়মিত তাকে দলে রাখছেন এবং তিনি বড় ম্যাচে নজর কাড়তে পারেন।
১৫. মোহাম্মদ আমুরা (আলজেরিয়া)

বয়স: ২৬
পজিশন: স্ট্রাইকার/উইঙ্গার
ক্লাব: উলফসবুর্গ
আফ্রিকা বাছাইপর্বে তিনি ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। ক্লাব পর্যায়ে উলফসবুর্গের জন্য মৌসুম ভালো না গেলেও জাতীয় দলে তিনি প্রধান ভরসা।
১৬. লুইস সুয়ারেজ (কলম্বিয়া)

বয়স: ২৮
পজিশন: স্ট্রাইকার
ক্লাব: স্পোর্টিং
লুইস সুয়ারেজ পর্তুগিজ লিগে প্রথম মৌসুমেই ৩৮ গোল করেছেন। ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে এক ম্যাচে একাই ৪ গোল করেন।
১৭. ব্রায়ান গুতিয়েরেজ (মেক্সিকো)

বয়স: ২২
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: চিভাস দে গুয়াদালাহারা
তিনি আগে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেললেও পরে মেক্সিকোকে বেছে নেন। ক্লাব দল চিভাসে যোগ দেওয়ার পর তিনি দলের আক্রমণভাগে বড় ভূমিকা রাখছেন।
১৮. বাজুমানা তুরে (আইভরি কোস্ট)

বয়স: ২০
পজিশন: লেফট উইঙ্গার
ক্লাব: হফেনহাইম
তার গতি এত বেশি যে তাকে ‘দ্য হারিকেন’ নামে ডাকা হয়। ৩০ ম্যাচে ১২ অ্যাসিস্ট করেছেন এবং জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার লড়াই করছেন।
১৯. ইব্রাহিম মাজা (আলজেরিয়া)

বয়স: ২০
পজিশন: মিডফিল্ডার
ক্লাব: বায়ার লেভারকুজেন
তিনি জার্মান বয়সভিত্তিক দলে খেললেও পরে আলজেরিয়ার হয়ে খেলতে শুরু করেন। আলজেরিয়ার এই উঠতি তারকা গোল করতে ও সুযোগ তৈরি করতে সমানভাবে দক্ষ।
২০. লুকা ভুসকোভিচ (ক্রোয়েশিয়া)

বয়স: ১৯
পজিশন: সেন্টার-ব্যাক
ক্লাব: টটেনহ্যাম (হামবুর্গে লোনে)
১৬ বছর বয়সেই ক্লাব ফুটবলে অভিষেক হওয়া এই ডিফেন্ডার দ্রুতই আলোচনায় আসেন। হামবুর্গে লোনের হয়ে তিনি গত মৌসুমে ৬ গোলসহ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন।
বিশ্বকাপ শেষে তিনি টটেনহ্যামে গিয়ে মূল দলে খেলার প্রত্যাশা করছেন।
বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস












































