ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে, আর টুর্নামেন্টটি যৌথভাবে আয়োজন করবে তিন দেশ – যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এই মহাযজ্ঞ।
মোট ১৬টি শহরের ১৬টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের বোস্টন থেকে শুরু করে কানাডার পশ্চিম উপকূলের ভ্যানকুভার এবং মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে এই ফুটবল মহারণ।
এক নজরে দেখে নেই –
১. আটলান্টা স্টেডিয়াম
আটলান্টা, জর্জিয়া 👥 ধারণক্ষমতা: ৭৫,০০০ ; নির্মাণ: ২০১৭

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র আটলান্টা দীর্ঘদিন ধরেই খেলাধুলা ও বিনোদনের বড় মঞ্চ হিসেবে পরিচিত। তবে আটলান্টা বিশেষভাবে আমেরিকান কলেজ ফুটবলের জন্য বিখ্যাত। শহরটির আকাশরেখার সঙ্গে মানিয়ে নির্মিত ভবিষ্যতধর্মী নকশার এই স্টেডিয়ামটি আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত হয়। অত্যাধুনিক স্থাপত্যবিশিষ্ট স্টেডিয়ামটি বিশ্বকাপে ৮টি ম্যাচ আয়োজন করবে, যার মধ্যে একটি সেমিফাইনালও রয়েছে।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম নামে পরিচিত এই ভেন্যুর বিশেষ আকর্ষণ রিট্র্যাক্টেবল (খোলা-বন্ধ করা যায় এমন) ছাদ এবং ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও ডিসপ্লে। রিট্র্যাক্টেবল ছাদটি আটটি বিশাল পাপড়ির মতো খুলে যায়, যা বিশ্বের অন্যতম অনন্য স্টেডিয়াম নকশা। বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনালসহ মোট আটটি ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত হবে, ফলে ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টে আটলান্টা হবে অন্যতম ব্যস্ত ফুটবলনগরী।
২. বোস্টন স্টেডিয়াম
ফক্সবরো, ম্যাসাচুসেটস👥 ধারণক্ষমতা: ৬৫,০০০- নির্মাণ: ২০০২

বোস্টন মাঠে একটি NFL গেইমের দৃশ্য
বোস্টনের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি NFL-এর নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টস এবং MLS-এর নিউ ইংল্যান্ড রেভলিউশনের ঘরের মাঠ।
বিশ্বকাপের আগে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম আউটডোর হাই-ডেফিনিশন ভিডিও বোর্ড।
বোস্টন মাঠে একটি NFL গেইমের দৃশ্য
৩. ডালাস স্টেডিয়াম
📍 আরলিংটন, টেক্সাস 👥 ধারণক্ষমতা: ৯৪,০০০- নির্মাণ: ২০০৯

ডালাস কাউবয়েসের ঘরের মাঠ- ২০০৯ থেকে
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম ডালাস স্টেডিয়াম কেবল আকারেই নয়, প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার দিক থেকেও বিশ্বের সেরা ভেন্যুগুলোর একটি। ৯৪ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই বিশাল স্থাপনা যেন একটি ছোট শহরের সমান এবং NFL-এর ডালাস কাউবয়েজের ঘরের মাঠ।
AT&T Stadium নামে পরিচিত ভেন্যুটির ভেতরে থাকা বিশাল ভিডিও স্ক্রিন পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়াম ডিসপ্লেগুলোর একটি। নয়টি ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে এটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে ব্যস্ত ভেন্যুতে পরিণত হবে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার একাধিক ম্যাচ এবং একটি সেমিফাইনাল এখানে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের নজর থাকবে এই স্টেডিয়ামের দিকে।
ডালাস কাউবয়েসের ঘরের মাঠ- ২০০৯ থেকে
৪. হিউস্টন স্টেডিয়াম
হিউস্টন, টেক্সাস👥 ধারণক্ষমতা: ৭২,০০০ নির্মাণ: ২০০২

এটি NFL ইতিহাসের প্রথম রিট্র্যাক্টেবল ছাদযুক্ত স্টেডিয়াম।
স্টেডিয়ামটি হিউস্টন টেক্সান্সের ঘরের মাঠ এবং বহু আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ ও কোপা আমেরিকার ম্যাচ আয়োজন করেছে। এবং এই স্টেডিয়ামটি যেকোনো ফুটবল ভেন্যুরই প্রায় দ্বিগুণ।
৫. কানসাস সিটি স্টেডিয়াম
কানসাস সিটি, মিসৌরি 👥 ধারণক্ষমতা: ৭৩,০০০- নির্মাণ: ১৯৭২

বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চ শব্দসম্পন্ন আউটডোর স্টেডিয়াম হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস স্বীকৃতি দিয়েছে।
এখানে একটি সেমিফাইনালসহ মোট ৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
৬. লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
ইঙ্গলউড, ক্যালিফোর্নিয়া 👥 ধারণক্ষমতা: ৭০,০০০- নির্মাণ: ২০২০

মাত্র কয়েক বছর আগে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক। ক্যালিফোর্নিয়ার ঝলমলে বিনোদন জগতের প্রতিচ্ছবি যেন এই স্থাপনা, যেখানে খেলাধুলা, প্রযুক্তি এবং স্থাপত্য একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।
SoFi Stadium নামে পরিচিত এই ভেন্যুটি ২০২৮ সালের অলিম্পিক গেমসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গ্রুপ ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্বাগতিক দলের সমর্থকদের ঢল নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৭. মিয়ামি স্টেডিয়াম
📍 মিয়ামি গার্ডেন্স, ফ্লোরিডা
👥 ধারণক্ষমতা: ৬৫,০০০
🏗 নির্মাণ: ১৯৮৭

NFL, ফর্মুলা-১ মিয়ামি গ্রাঁ প্রি এবং মিয়ামি ওপেন টেনিস—সবকিছুর জন্যই বিখ্যাত এই ভেন্যু।
এখানে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ (ব্রোঞ্জ ফাইনাল) অনুষ্ঠিত হবে।
৮. নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়াম
📍 ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি
👥 ধারণক্ষমতা: ৮২,৫০০- নির্মাণ: ২০১০

বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্যটি রচিত হবে এখানেই। ১৯ জুলাই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ম্যাচ—ফাইনাল—আয়োজন করবে এই বিশাল স্টেডিয়াম।
নিউইয়র্ক মহানগরীর ঠিক পাশে অবস্থিত হওয়ায় এটি কেবল একটি স্টেডিয়াম নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রবেশদ্বার। এর আগে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। টেলর সুইফট, বিয়ন্সে ও এড শিরানের মতো তারকাদের কনসার্ট আয়োজনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে এই ভেন্যুর। ভক্তদের কাছে এটি MetLife Stadium নামে পরিচিত।
৯. ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম (Philadelphia Stadium)
ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
👥 ধারণক্ষমতা: ৬৯,০০০- নির্মাণ: ২০০৩

ডেলাওয়্যার নদীর তীরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি Lincoln Financial Field নামে বেশি পরিচিত। সর্বপ্রথম টিকেটের বিনিময়ে কোনো ইভেন্টের আয়োজন করে এই স্টেডিয়াম ২০০৩ সালে, ৬৮,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে সেইদিন ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বার্সেলোনাকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিলো।
১০. সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
সান্তা ক্লারা, ক্যালিফোর্নিয়া 👥 ধারণক্ষমতা: ৭১,০০০- নির্মাণ: ২০১৪

NFL-এর সান ফ্রান্সিসকো ফরটি নাইনারস এর ঘরের মাঠ।
এটি সাধারণত Levi’s Stadium নামে পরিচিত। এই ভেন্যুই সর্বশেষ এই বছরের ফেব্রুয়ারীতে পুয়ের্তো রিকো মেগাস্টার ব্যাড বানিকে হোস্ট করেছে।
১১. সিয়াটল স্টেডিয়াম
সিয়াটল, ওয়াশিংটন 👥 ধারণক্ষমতা: ৬৯,০০০- নির্মাণ: ২০০২

শহরের স্কাইলাইনের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায় এখান থেকে।
স্টেডিয়ামটির প্রচলিত নাম “ লুমেন ফিল্ড” ।
১২. টরন্টো স্টেডিয়াম (Toronto Stadium)
টরন্টো, অন্টারিও 👥 ধারণক্ষমতা: ৪৫,০০০- নির্মাণ: ২০০৭

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ কানাডার মাটিতে প্রথম ম্যাচটি এখানেই অনুষ্ঠিত হবে।
১৩. বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
ভ্যাঙ্কুভার, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া 👥 ধারণক্ষমতা: ৫৪,০০০- নির্মাণ: ১৯৮৩

ফলস ক্রিকের তীরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি কানাডার অন্যতম পরিচিত ক্রীড়া অবকাঠামো। এর বিশাল সাদা গম্বুজাকৃতির ছাদ দূর থেকেই নজর কাড়ে।
২০১৫ নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী ছিল এই ভেন্যু। এবার পুরুষ বিশ্বকাপেও স্বাগতিক কানাডার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো এখানে অনুষ্ঠিত হবে, যা স্থানীয় সমর্থকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠবে।
১৪. মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম (Mexico City Stadium)
মেক্সিকো সিটি 👥 ধারণক্ষমতা: ৮৩,০০০- নির্মাণ: ১৯৬৬

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম স্টেডিয়ামই আছে, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই কিংবদন্তিদের স্মৃতি ফিরে আসে। সাবেক এস্তাদিও আজতেকা সেই বিরল ভেন্যুগুলোর একটি।
পেলে ১৯৭০ সালে এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে এখানেই বিশ্বকাপ জয় করেছিলেন। ২০২৬ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করে নতুন ইতিহাস গড়বে স্টেডিয়ামটি। ১১ জুন এখানেই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা।
১৫. এস্তাদিও গুয়াদালাহারা (Estadio Guadalajara)
জাপোপান, জলিস্কো 👥 ধারণক্ষমতা: ৪৮,০০০- নির্মাণ: ২০১০

বর্তমানে এস্তাদিও আকরান নামে পরিচিত এই স্টেডিয়ামটি অনন্য গোলাকার নকশার জন্য বিখ্যাত।
উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়ামগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এস্তাদিও গুয়াদালাহারা। এর গোলাকার ও আধুনিক নকশা অনেকটা আগ্নেয়গিরির আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত।
স্থানীয় ক্লাব সিডি গুয়াদালাহারার ঘরের মাঠ এই ভেন্যুতে ফুটবলের আবেগ সবসময়ই তুঙ্গে থাকে। বিশ্বকাপের সময় সেই আবেগ আন্তর্জাতিক রূপ নেবে, বিশেষ করে মেক্সিকোর ম্যাচগুলোকে ঘিরে।
১৬. এস্তাদিও মনতেরে (Estadio Monterrey)
গুয়াদালুপে, নুয়েভো লেওন 👥 ধারণক্ষমতা: ৫৩,৫০০- নির্মাণ: ২০১৫

মেক্সিকান ক্লাব মনতেরের ঘরের মাঠ।
ফুটবলের পাশাপাশি এখানে বিশ্বের শীর্ষ সংগীতশিল্পীদের কনসার্টও অনুষ্ঠিত হয়। শাকিরা, জাস্টিন বিবার, ব্যাড বানি এবং কোল্ডপ্লের মতো তারকারা এখানে পারফর্ম করেছেন।
সংক্ষেপে –
| দেশ | স্টেডিয়াম সংখ্যা |
| 🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র | ১১ |
| 🇨🇦 কানাডা | ২ |
| 🇲🇽 মেক্সিকো | ৩ |
| মোট | ১৬ |
বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস