মঙ্গলবার । জুন ৯, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক খেলা ৯ জুন ২০২৬, ৫:৫৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

ফিফা বিশ্বকাপে রেকর্ড গড়ল ১৩টি মুসলিমপ্রধান দেশ


Muslim Country

উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আঙিনায় বসতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। তবে এবারের আসরটি কেবল যৌথ আয়োজনের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের সমীকরণ বদলে দেওয়ার কারণেও ইতিহাসের পাতায় আলাদা জায়গা করে নিচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই ফুটবল মহাযজ্ঞে দেখা যাবে এক অনন্য বৈচিত্র্য। দলসংখ্যা বৃদ্ধির কল্যাণে এবার বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে রেকর্ডসংখ্যক ১৩টি মুসলিমপ্রধান দেশ, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের এক নতুন রেকর্ড।

ফিফার দলসংখ্যা বাড়ানোর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত মূলত এশিয়া ও আফ্রিকার উদীয়মান ফুটবল শক্তিগুলোর জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কোয়ালিফায়ারের কঠিনম্যাচ পার হয়ে এই দলগুলোর মূল পর্বে আসা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি মূলত তৃণমূল স্তরের উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং পেশাদার লিগগুলোতে দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল।

মরক্কো
গত কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। বিশ্বমঞ্চে বড় বড় পরাশক্তিদের হারানোর সামর্থ্য তারা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে। এবারও ফুটবল ভক্তদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে উত্তর আফ্রিকার এই টেকনিক্যাল ফুটবল পরাশক্তি এবং স্বাভাবিকভাবেই পুরো বিশ্বের চোখ থাকবে তাদের ওপর।

Morocco

ভক্তদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে উত্তর আফ্রিকার এই টেকনিক্যাল ফুটবল পরাশক্তি

ইরাক
এবারের আসরে সবচেয়ে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত অপেক্ষা করছে ইরাকের জন্য। দীর্ঘ ৪০ বছর বা চার দশকের দীর্ঘ খরা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরছে দেশটির ফুটবল। তাদের এই অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবল অঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনা ও আশার জন্ম দিয়েছে।

তুরস্ক
ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী ফুটবল দেশ তুরস্ক। দীর্ঘ ২৪ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আবারও বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। মাঠের লড়াকু ফুটবল আর ইউরোপীয় লিগগুলোতে খেলা তারকাদের সমন্বয়ে গড়া এই দলটি এবার বিশ্বমঞ্চে বড় চমক দেখানোর জন্য প্রস্তুত।

সেনেগাল
আফ্রিকার অন্যতম শারীরিক সক্ষমতা ও গতির ফুটবল খেলা পরাশক্তি সেনেগাল। মরক্কোর মতোই বিশ্বমঞ্চে যেকোনো বড় দলের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করার ক্ষমতা তারা বারবার প্রমাণ করেছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা একঝাঁক বিশ্বমানের তারকা নিয়ে এবার উত্তর আমেরিকায় নিজেদের শক্তির জানান দেবে তারা।

জর্ডান
বিশ্ব ফুটবলের ক্রমবর্ধমান তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে এবার অন্যতম বড় চমক হিসেবে হাজির হয়েছে জর্ডান। দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের কোয়ালিফাই করার যোগ্যতা প্রমাণ করেছে এই উদীয়মান দলটি। নতুন দল হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রথম ছাপ রাখার জন্য মুখিয়ে আছে তারা।

Jordan

দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের কোয়ালিফাই করার যোগ্যতা প্রমাণ করেছে

উজবেকিস্তান
মধ্য এশিয়ার শারীরিক সক্ষমতাভিত্তিক ফুটবলের অন্যতম সেরা প্রতিনিধি উজবেকিস্তান। মূলত আধুনিক ফুটবল অবকাঠামো ও পেশাদার লিগের পেছনে দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে এবার তারা মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলের নতুন শক্তির উত্থানের প্রতীক।

মিশর
ফুটবল ঐতিহ্যে আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ মিশর। তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলশৈলী এবং বিশ্বমানের ফরওয়ার্ড লাইনের কারণে ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে তারা সবসময়ই সমীহ জাগানো এক দল। কোয়ালিফায়ারে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেই তারা বিশ্বমঞ্চের টিকিট কেটেছে।

আলজেরিয়া
উত্তর আফ্রিকার নিখুঁত ও টেকনিক্যাল ফুটবলের আরেক শক্তিশালী নাম আলজেরিয়া। চমৎকার ড্রিবলিং আর ক্ষিপ্রগতির কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের জন্য পরিচিত এই দলটি টুর্নামেন্টে নতুন কৌশলগত গভীরতা ও রোমাঞ্চ যোগ করবে।

সৌদি আরব
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সুশৃঙ্খল ও কৌশলগত ফুটবল খেলা দেশ সৌদি আরব। বিগত বিশ্বকাপগুলোতে বড় দলগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে তাদের। নিজেদের ঘরোয়া লিগের অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং আধুনিক ফুটবল দর্শনের হাত ধরে এবারও তারা বিশ্বমঞ্চে বড় পরীক্ষা নিতে প্রস্তুত।

কাতার
গত বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কাতার এবার নিজেদের যোগ্যতায় এবং কোয়ালিফায়ারের কঠিন বাধা পেরিয়ে উত্তর আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দলটির সুশৃঙ্খল রণকৌশল ও গত কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা টুর্নামেন্টে শৈলীগত বৈচিত্র্য নিয়ে আসবে।

ইরান
এশিয়ার ফুটবলে অন্যতম ধারাবাহিক এবং পাওয়ার-ফুটবল খেলা দল ইরান। শারীরিক শক্তি এবং রক্ষণভাগের সুশৃঙ্খল শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত এই দেশটি প্রতিপক্ষের জন্য সবসময়ই এক কঠিন বাধা। এশীয় অঞ্চলের অন্যতম সেরা দল হিসেবেই তারা এবার মূল পর্বে পা রেখেছে।

Iran

এশিয়ার ফুটবলে অন্যতম পাওয়ার-ফুটবল খেলা দল ইরান

তিউনিসিয়া
আন্ডারডগ হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম লড়াকু ফুটবল শক্তি তিউনিসিয়া। উত্তর আফ্রিকার চেনা টেকনিক্যাল ফুটবলের সাথে আধুনিক ইউরোপীয় ঘরানার ট্যাকটিকসের এক দারুণ মিশ্রণ দেখা যায় তাদের খেলায়। কোয়ালিফায়ারের কঠিন সমীকরণ পার হয়েই তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
ইউরোপের ফুটবল আঙিনা থেকে উঠে আসা অন্যতম বৈচিত্র্যময় দল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। তাদের শারীরিক সক্ষমতা এবং বল নিয়ন্ত্রণের আধুনিক কৌশল ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আগের চেয়ে অনেক বেশি ফুটবল দর্শনের রোমাঞ্চকর মিশ্রণ তৈরি করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

Bosnia and Herzegovina

ইউরোপের ফুটবল আঙিনা থেকে উঠে আসা অন্যতম বৈচিত্র্যময় দল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৩টি দেশের উপস্থিতি কেবল একটি টুর্নামেন্টেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মাঠের খেলায় এনে দেবে কৌশলগত অনন্য বৈচিত্র্য। উত্তর আফ্রিকার নিখুঁত টেকনিক্যাল ড্রিবলিং, মধ্যপ্রাচ্যের সুশৃঙ্খল রক্ষণাত্মক রণকৌশল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়ার শক্তিনির্ভর শারীরিক ফুটবল—সব মিলিয়ে দর্শকরা এবার বহুমুখী ফুটবল দর্শনের এক রোমাঞ্চকর মিশ্রণ উপভোগ করতে পারবেন।

মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এই আসরের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও বিশাল। রেকর্ডসংখ্যক এই দেশগুলোর অংশগ্রহণ বিশ্বমঞ্চে মুসলিম সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক ও গৌরবময় প্রতিচ্ছবি তুলে ধরবে। একই সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি নতুন বৈশ্বিক দর্শককে এই টুর্নামেন্টের সাথে এক সুতোয় বাঁধবে, যা ফুটবলকে বিশ্বজনীন মেলবন্ধনের ভাষা হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে। ২০২৬ সালের জুনে উত্তর আমেরিকা জুড়ে শুরু হওয়া ইতিহাসের বৃহত্তম এই ফুটবল উৎসবের পর্দা নামবে জুলাইয়ের জমকালো ফাইনালের মধ্য দিয়ে।

ভিজুয়াল স্টোরি