
ওমার আব্দুল কাদির আরতান
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক গোল আছে, অনেক ট্রফি আছে, অনেক কান্না আর উল্লাস আছে। কিন্তু কখনও কখনও একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা খেলার সীমা ছাড়িয়ে ন্যায়বিচার, বৈশ্বিক রাজনীতি এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন তুলে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক প্রাক্কালে এমনই এক ঘটনা বিশ্ব ফুটবলকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সোমালিয়ার রেফারি ‘ওমার আব্দুল কাদির আরতান’—যিনি কিনা প্রথমবারের মতো কোনো সোমালিয়ান হিসেবে ফুটবল বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, ফিরে গেলেন! যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন আসলে। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সোমালিয়ার এক অনন্য অভিষেক আর হলো না।
মরুভূমি পেরিয়ে যে বাঁশি বাজলো না বিশ্বমঞ্চে
সোমালিয়ার মতো একটি দেশে আন্তর্জাতিক মানের রেফারি হয়ে ওঠা নিজেই এক বিস্ময়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সন্ত্রাসবাদের ছায়ায় বেড়ে ওঠা দেশটির ক্রীড়াঙ্গনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি খুব কমই এসেছে।
১৯৯২ সালে মোগাদিশুতে জন্ম নেওয়া ওমর আবদুলকাদির আর্তান ২০১৮ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকাভুক্ত হন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি আফ্রিকার অন্যতম সেরা ম্যাচ কর্মকর্তায় পরিণত হন। ২০২৪ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে প্রথম সোমালিয়ান রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৫ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (CAF) তাঁকে আফ্রিকার সেরা পুরুষ রেফারি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর নির্বাচিত হবার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং ছিল পুরো সোমালিয়ার জন্য গর্বের মুহূর্ত।
বিমানবন্দরেই থেমে গেল স্বপ্ন
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শিবিরে যোগ দিতে তুরস্কের ইস্তাম্বুল হয়ে মিয়ামিতে পৌঁছান আর্তান। তাঁর কাছে বৈধ মার্কিন ভিসা ছিল, ফিফার আনুষ্ঠানিক নথিপত্রও ছিল। কিন্তু মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে তাঁকে আটকে রাখার পর যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ তাঁকে “vetting concerns” তথা নিরাপত্তা যাচাই-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা জানিয়ে দেশে প্রবেশের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে। পরে তাঁকে আবার তুরস্কে ফেরত পাঠানো হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। শুধু বলা হয়েছে, অতিরিক্ত যাচাইয়ের পর তাঁকে “inadmissible” বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ফুটবলের চেয়ে বড় হয়ে উঠলো রাজনীতি
এই ঘটনার পেছনে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিকেই দায়ী করছেন। সোমালিয়া বর্তমানে সেই দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে, যাদের নাগরিকদের ওপর কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যদিও বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও কর্মীদের জন্য কিছু ব্যতিক্রমী সুবিধা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে আর্তানের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বকাপ কি সত্যিই “বৈশ্বিক” আসর? যদি একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, পুরস্কারপ্রাপ্ত রেফারিও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সন্দেহের জালে আটকে যান, তাহলে বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র কোথায় দাঁড়ায়?
ফিফার অসহায়ত্ব
ঘটনার পর ফিফা একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, তারা কোনো দেশের অভিবাসন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আয়োজক দেশই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেয় কে প্রবেশ করতে পারবে এবং কে পারবে না। ফলে আর্তানের বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যখন বিশ্বকাপ তিনটি দেশে—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয়—অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন কি আর্তানকে অন্তত কানাডা বা মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা যেতো না?
ফিফার ব্যাখ্যা হলো, সব রেফারিকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা কাঠামোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না পারলে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ পড়তে হবে।
সোমালিয়ার ক্ষোভ
সোমালিয়ার ফুটবল ফেডারেশন এবং দেশটির ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন কর্মকর্তার প্রতি অবিচার নয়; এটি পুরো সোমালিয়ার ফুটবল অগ্রযাত্রার জন্য একটি বড় ধাক্কা।
সাবেক জাতীয় দল অধিনায়ক ও ক্রীড়া কর্মকর্তারা বলেছেন, আর্তান আফ্রিকার অন্যতম সম্মানিত রেফারি। তাঁকে বাদ দেওয়া ফুটবলের ন্যায়সঙ্গত ও মেধাভিত্তিক চেতনার পরিপন্থী।
একটি বাঁশির নীরবতা
ফুটবলে রেফারির কাজ সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয় না। তাঁরা গোল করেন না, ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন না, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামও হন না। কিন্তু ওমর আর্তানের ঘটনা দেখিয়ে দিল, কখনও কখনও একজন রেফারির অনুপস্থিতিও বিশ্বকে নাড়া দিতে পারে।
কারণ এটি কেবল একজন ম্যাচ কর্মকর্তার বিশ্বকাপ মিস করার গল্প নয়।
এটি এমন এক দেশের গল্প, যে দেশ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চেয়েছিলো।
এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি ব্যক্তিগত মেধা, পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন।
আর এটি এমন এক বাস্তবতার গল্প, যেখানে কখনও কখনও বৈধ ভিসা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কিংবা অসাধারণ যোগ্যতাও সীমান্তের কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারে না।
বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। মাঠে বাঁশি বাজবে, কোটি মানুষ উল্লাস করবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও, সেই বাঁশির শব্দের আড়ালে হারিয়ে যাবে আরেকটি ইতিহাস—প্রথম সোমালিয়ান বিশ্বকাপ রেফারির অসমাপ্ত অভিষেকের ইতিহাস।