
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভের পর এককভাবে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে প্রথম বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে দলটি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটিই প্রথম বাজেট। আজ বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন।
অর্থ বিভাগ সূত্র বলছে, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। এই বিপুল ব্যয়ের মধ্যে বড় অংশ অর্থাৎ ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকাই চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি প্রণোদনা ও নগদ ঋণসহ পরিচালন ব্যয় খাতে। আর দেশের উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বাসস জানিয়েছে, নতুন বাজেটে আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে বিরাজমান উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাকে এবারের বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ তেরটি ইস্যুকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকার পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে। এছাড়া উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে আজকের বাজেটে। পাশাপাশি দেশের ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই বাজেটের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, জিডিপি বৃদ্ধির গতি হ্রাস, প্রাইভেট বিনিয়োগ ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি ওপেনিং নেতিবাচক এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মাইনাস দুই শতাংশ হওয়ার মতো পুঞ্জীভূত সমস্যার মধ্যেই এই বাজেট ঘোষণা হচ্ছে। এগুলো পুনরুদ্ধার ও এরপর স্থিতিশীলতা অর্জনের বড় চ্যালেঞ্জ আছে। আবার নির্বাচনে দেওয়া বিএনপির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চাপও থাকবে এই বাজেটের ওপর। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি আনতে বিনিয়োগকে চাঙ্গা করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে, যা পূরণের জন্য সরকারকে ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে। সরকার ব্যাংকিং খাত থেকেই ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের সুদ এখনই ব্যয়ের শীর্ষে থাকায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ না বাড়লে ঘাটতি আরও বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি ঋণঝুঁকিতে পড়বে।
তাই উচ্চমূল্যস্ফীতি কমাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ চাঙ্গা করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরকারকে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেই চাপ সামলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির গতি ত্বরান্বিত করা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে নতুন সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি থাকবে।