
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশকে নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর
অপেক্ষার অবসান। আজ পর্দা উঠছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের। আগামী প্রায় ছয় সপ্তাহ বিশ্বজুড়ে বইবে ফুটবলের মহোৎসবের ঝড়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার সব বিভাজন ভুলে কোটি কোটি মানুষ ডুবে যাবে এক আবেগে, এক স্বপ্নে, এক উন্মাদনায়। চার বছর ধরে জমে থাকা প্রত্যাশা, উত্তেজনা আর কল্পনার রঙ আজ বাস্তবতার সবুজ গালিচায় ছড়িয়ে পড়বে।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশকে নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে শুরু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ফুটবল মহারণ। আর এই মহাযজ্ঞের উদ্বোধনী মঞ্চ আলোকিত করবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়াম। জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুর ও আলোর মূর্ছনায় মঞ্চ কাঁপাবেন কলম্বিয়ান পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা, নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়, কলম্বিয়ার জে বালভিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার গায়িকা টাইলা।
চার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে আবারও শুরু হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ। এমন এক উৎসব, যার জন্য কোটি হৃদয় গুনেছে অসংখ্য দিন-রাত। এবারের বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ ফুটবল ছড়িয়ে পড়বে তিনটি দেশের ১৬টি শহরে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বাছাইয়ের কঠিন পথ পেরিয়ে আসা ১,২৪৮ জন ফুটবলযোদ্ধা সবুজ মাঠকে রাঙাবেন স্বপ্ন, সংগ্রাম আর শৈল্পিক নৈপুণ্যের রঙে। তাদের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হবে স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু করে কোটি কোটি টিভি দর্শক।
৪০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের আলোয় ঝলমল করছে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়াম। ফুটবল ইতিহাসের এই মহাতীর্থেই একদিন বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে এবং ফুটবল ঈশ্বরখ্যাত দিয়েগো ম্যারাডোনা। আজ তারা নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতি, তাদের কিংবদন্তি এবং তাদের সৃষ্ট জাদু যেন এখনও ভাসে আজটেকার বাতাসে। স্বর্গ থেকে হয়তো তারাও তাকিয়ে থাকবেন নতুন কোনো নায়কের জন্ম দেখার আশায়।
উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে এবারের বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচ। মেক্সিকোর হৃদয় থেকে যাত্রা শুরু করা এই বৈশ্বিক ফুটবল উৎসবের শেষ অধ্যায় রচিত হবে আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ফাইনালে। সেই দিনই জানা যাবে কার হাতে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি, কার চোখে ঝরবে আনন্দাশ্র“, আর কার স্বপ্ন ভেঙে যাবে শেষ বাঁশির সঙ্গে।
চারটি করে দল নিয়ে গঠিত হয়েছে ১২টি গ্রুপ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম যুক্ত হচ্ছে ‘রাউন্ড অব ৩২’, যা নকআউট লড়াইকে আরও বিস্তৃত ও রোমাঞ্চকর করে তুলবে। শুধু মাঠেই নয়, অর্থনীতিতেও বিশাল প্রভাব ফেলবে এই মহাযজ্ঞ। ধারণা করা হচ্ছে, তিন আয়োজক দেশের সম্মিলিত অর্থনীতিতে যোগ হবে প্রায় ৮ হাজার ১০ কোটি ডলার। বেড়েছে পুরস্কারের অঙ্কও। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল সোনালি ট্রফির পাশাপাশি পাবে ৫ কোটি ডলার, আর রানার্সআপ দলের প্রাপ্তি হবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
ম্যাচ শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে শুরু হবে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছেন শাকিরা, যার কণ্ঠ বিশ্বকাপের স্মৃতিকে বারবার নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তার সঙ্গে থাকবেন বার্না বয়, জে বালভিন ও টাইলা। সুর, আলো, সংস্কৃতি এবং ফুটবলের অপূর্ব মেলবন্ধনে বিশ্বকে স্বাগত জানাবে মেক্সিকো সিটি।
বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এক বার্তায় বলেছেন, ‘ফিফা বিশ্বকাপ এমন একটি মুহূর্ত, যা পুরো পৃথিবী একসঙ্গে অনুভব করে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে সংগীত, সংস্কৃতি ও ফুটবলের এক অনন্য সংমিশ্রণ, যেখানে প্রতিটি জাতির স্বাতন্ত্র্য ও সৌন্দর্য বিশ্বমঞ্চে উঠে আসবে। এটি হবে সত্যিকারের বৈশ্বিক উদযাপন।’
তবে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই বিশ্বকাপের রঙে কিছুটা ছায়া ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জটিলতা ও নানা প্রশাসনিক টালবাহানা। তবুও ফুটবল প্রেমীদের বিশ্বাস, মাঠের লড়াই, তারকাদের জাদু, অপ্রত্যাশিত নাটকীয়তা এবং নতুন ইতিহাস রচনার গল্প সব বিতর্ককে ছাপিয়ে এই বিশ্বকাপকে পরিণত করবে স্মরণকালের অন্যতম সেরা আসরে।
এস এম সুমন: সিনিয়র স্পোর্টস জার্নালিস্ট।
বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস