
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তি চুক্তির কাঠামোতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। শনিবার তিনি বলেন, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়াও প্রস্তুত হয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এটি ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তান এখন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগামী সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন আগামী ৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভি। এর আগে ৬, ৭ ও ৯ জুলাই যথাক্রমে তেহরান, কোম ও মাশহাদে তার জানাজা ও শোকানুষ্ঠান হবে। পরে মাশহাদের ইমাম রেজার পবিত্র মাজারে তাকে দাফন করা হবে।
শাহবাজ শরিফ বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে। এখন উভয় পক্ষের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের কাজ করছে পাকিস্তান।
চলতি সপ্তাহে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি হামলার পর পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে নতুন এই অগ্রগতি পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আশা জাগিয়েছে।
কবে স্বাক্ষর হবে চুক্তি?
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তিনজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে শিথিল করা হবে এবং দেশটির জব্দকৃত সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করে দেওয়া হবে।
তাদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে পারে।
শান্তির আশায় তেলের দাম কমেছে
সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাড়ার ইঙ্গিত এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হওয়ার আশায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৩৩ ডলারে নেমে এসেছে, যা মার্চের পর সর্বনিম্ন। একই সময়ে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৮৪ দশমিক ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপে গ্যাসের দামও প্রায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে কী আছে?
প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করবে এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
এছাড়া ৬০ দিনের আলোচনাকালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস ও দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, তেহরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে রাজি নয়। তার ভাষায়, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কম মাত্রায় রূপান্তর করাই ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান।
এদিকে কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তিতে ইরানের জন্য যুদ্ধক্ষতিপূরণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ও রয়েছে। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা এ দাবি নাকচ করেছেন।
সব মিলিয়ে, কয়েক মাসের সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।