
উভয় পক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হবে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকা পাকিস্তানও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। যদিও চূড়ান্ত চুক্তি এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি, তবুও উভয় পক্ষ এবং পাকিস্তানের দেওয়া তথ্য থেকে খসড়া সমঝোতার মূল বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী প্রক্রিয়া
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, উভয় পক্ষ সব ধরনের সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
উভয় দেশ জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানের সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষরিত হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, স্বাক্ষরের পরই পূর্ণাঙ্গ চুক্তি প্রকাশ করা হবে।
এ ছাড়া উভয় পক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার শুরু হবে।
পরবর্তী ৬০ দিনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসহ জটিল বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
হরমুজ প্রণালি ও বন্দর অবরোধ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শুক্রবার থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে ইরান।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা
দুই পক্ষই জানিয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না—এ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইরানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়াবে না এবং নতুন পারমাণবিক স্থাপনাও সম্প্রসারণ করবে না।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় ইরান নিজের ভূখণ্ডেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমিয়ে আনার সুযোগ পাবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক উপাদান দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কোনো তাড়া নেই। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা থাকবে, যদিও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি কংগ্রেসের অনুমোদন পেতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিষয়
ইরানের দাবি, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইরানের তেল খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পর ধাপে ধাপে সব মার্কিন ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
ইরানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ২৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ইরানি জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি অর্থ ছাড়, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আর্থিক ঋণসুবিধার বিষয়ও রয়েছে।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করবে, যা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে।
তবে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়া হবে না, যদিও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
লেবানন ইস্যু
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকেই লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীিআব্বাস আরাঘচি বলেছেন, লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং এই সমঝোতা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকেও নিতে হবে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীিইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় দখলে থাকা নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান অব্যাহত রাখবে। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ অবস্থান ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
চুক্তি ঘোষণার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। তার মতে, লেবাননের ওপর আর কোনো ইসরায়েলি হামলা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর কোনো হামলাই হওয়া উচিত নয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতার ঘোষণা ইতিবাচক হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং লেবানন ইস্যুতে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান বাকি রয়েছে। তাই চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনার ওপর।
বাংলা টেলিগ্রাফ পর্যবেক্ষণ