
ছবি: সংগৃহীত
দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের কার্গো ও এভিয়েশন হাব এবং উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্য বাড়াতে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই দেশের কয়েকটি বিমানবন্দরের অবকাঠামো, যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই বন্ধ বিমানবন্দরগুলো সচল করা হচ্ছে। বর্তমানে একটি স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে। এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, দেশের সাত থেকে আটটি বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দেশের ভৌগোলিক মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় বগুড়াকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক মানের কার্গো পরিবহনের কেন্দ্র বা এভিয়েশন হাব গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনাটি ইতিমধ্যেই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে ১০ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণ করা হবে, যাতে বোয়িং ৭৩৭-৮০০-সহ বড় আকারের যাত্রী ও কার্গো উড়োজাহাজ সহজেই ওঠানামা করতে পারে। এ ছাড়া একটি আধুনিক টার্মিনাল ভবন, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ও কার্গো কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের নকশা ও কারিগরি সমীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) পরামর্শক হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। মেগা এই প্রকল্পে কয়েক শ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরও পেতে যাচ্ছে নতুন প্রাণ। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বেবিচকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরটির আধুনিকায়নে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রথম ধাপে জমি অধিগ্রহণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং নতুন টার্মিনাল ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের উচ্চপর্যায়ের একটি দল বিমানবন্দরটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।
বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ের পাশাপাশি লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), খানজাহান আলী (বাগেরহাট) এবং পটুয়াখালী বিমানবন্দর নিয়েও সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনা রয়েছে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অব্যবহৃত এসব বিমানবন্দর পুনরায় চালুর একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বিমানবন্দরের নিজস্ব আয়-ব্যয় দিয়ে এর লাভক্ষতি বিচার করা ঠিক হবে না। একটি বিমানবন্দরকে ঘিরে হোটেল, পরিবহন, ব্যবসা ও পর্যটনসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখে। যেমন শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্প ব্যাপক চাঙা হবে। আবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ঈশ্বরদীতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত বাড়ছে, ফলে ওই বিমানবন্দরটিরও বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৩টি আন্তর্জাতিক ও ৫টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর চালু রয়েছে। বন্ধ বিমানবন্দরগুলো সচল করা গেলে দেশের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে, যার সরাসরি সুফল পাবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ।