
বিশ্বকাপ ২০২৬ এর প্রথম ম্যাচে হ্যাট্রিক করা মেসি
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর চতুর্থ দিনটাই তরুণ তারকাদের ক্যারিশমার দিন হওয়ার কথা। সকালে কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে জেতালেন। কিছুক্ষণ পর আরলিং হালান্ড ইরাকের জালে দুইবার বল পাঠিয়ে নরওয়ের বিশ্বকাপ যাত্রাকে রাঙিয়ে দিলেন। ফুটবলবিশ্ব যেন নতুন করে ঘোষণা শুনছিলো- এ বিশ্বকাপ তাদের।
কিন্তু রাত শেষ হওয়ার আগেই সেই ঘোষণাপত্র ছিঁড়ে ফেললেন আরেকজন। তিনি লিওনেল মেসি।
৩৮ বছর বয়সে, ষষ্ঠ বিশ্বকাপে, আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি যেন বললেন— “তোমরা ভবিষ্যৎ হতে পারো, কিন্তু বর্তমান এখনো আমার।” জলে-স্থলে- ব্যোমে কার রাজ্যপাট? আমিই মেসি। আমিই ফুটবল সম্রাট!
অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, মেসি কি বুড়িয়ে গেছেন? বয়স কি অবশেষে তাঁকে ধরেছে?
ক্যানসাস সিটির রাতের পর প্রশ্নটা পাল্টে গেছে।
মেসি বুড়িয়ে যাননি। বরং তিনি ফুটবলের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যেখানে শারীরিক শক্তির ঘাটতি পূরণ করে দিচ্ছে অতিমানবীয় পাঠক্ষমতা- ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই ম্যাচ পড়ে ফেলার ক্ষমতা।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর তিনটি চোখ ধাঁধানো গোলের চেয়েও বেশি বিস্ময়কর ছিল তাঁর চলাফেরা। প্রথমার্ধেই তাঁকে দেখা গেছে নিজেদের ডিফেন্সিভ থার্ডে নেমে বল কাড়তে। আবার কয়েক সেকেন্ড পরই আক্রমণের শেষ প্রান্তে গিয়ে জায়গা তৈরি করতে। বয়স যেন কেবল পাসপোর্টের একটি সংখ্যা। মাঠে দেখা যাচ্ছিলো একজন ফুটবলারকে, যিনি জানেন ঠিক কোন মুহূর্তে কোথায় থাকতে হবে।
একসময় মেসির খেলা ছিল বিস্ফোরক গতি, ড্রিবলিং আর শরীরের ভারসাম্য আর পায়ের জাদুর গল্প। এখন তাঁর খেলা মূলত মস্তিষ্কের খেলা।
তিনি আর প্রতিটি ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগোন না। বরং এমন জায়গায় দাঁড়ান, যেখানে ডিফেন্ডারদের কাটানোর প্রয়োজনই পড়ে না।
ফুটবলে একটি শব্দ আছে— ‘anticipation’। অর্থাৎ ঘটনা ঘটার আগেই তা অনুমান করার ক্ষমতা। আজকের মেসি সম্ভবত এই শিল্পের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।
দ্বিতীয় গোলটি তারই প্রমাণ। গোলরক্ষক লুকা জিদান বল ফেলে দেওয়ার আগেই মেসি বুঝে গিয়েছিলেন কোথায় বল পড়বে। অন্য সবাই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে; মেসি আগেই প্রস্তুত ছিলেন। এটাই বয়সী মেসি ও তরুণ মেসির পার্থক্য।
তরুণ মেসি মুহূর্ত তৈরি করতেন।
বৃদ্ধ মেসি মুহূর্তের আগেই সেখানে উপস্থিত থাকেন।
এ কারণেই তাঁর বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকটি শুধুই পরিসংখ্যান নয়। এটি ফুটবল বুদ্ধিমত্তার এক অমর কাব্যগাঁথা।
আরেকটি ব্যাপারও লক্ষণীয়।
ম্যাচের আগে পুরো বিশ্ব কথা বলছিলো এমবাপ্পে ও হালান্ডকে নিয়ে। একজন বিশ্বকাপে ১৪ গোলের মালিক, অন্যজন প্রথম বিশ্বকাপেই গোলের খাতা খুলেছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, গোল্ডেন বুটের লড়াই এবার নতুন প্রজন্মের হাতে চলে যাচ্ছে।
মেসি উত্তর দিলেন হ্যাটট্রিক দিয়ে।
যেন তিনি মাঠে নামার আগে দুই ম্যাচই দেখে ফেলেছিলেন। বুঝে ফেলেছিলেন, আলো কোথায় যাচ্ছে। তারপর সেই আলো নিজের দিকে টেনে নিলেন।
এটাই হয়তো সর্বকালের সেরাদের বৈশিষ্ট্য।তারা শুধু ম্যাচ খেলে না। তারা গল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তাঁর ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপে ১৬ গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বকালের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ছয়টি আসরে খেলা প্রথম ফুটবলারও তিনি।
কিন্তু সংখ্যাগুলোও হয়তো পুরো গল্প বলে না। কারণ এই মেসির আসল শক্তি আর গোল নয়।
আসল শক্তি হলো সময়কে হারিয়ে দেওয়া।
যখন অধিকাংশ ফুটবলার ৩৮ বছরে এসে শরীরের সঙ্গে লড়াই করেন, তখন মেসি খেলছেন সময়ের সঙ্গে। এবং অন্তত এই রাতে, সময় হেরেছে। পাঁচ বিশ্বকাপে গোল করা দ্বিতীয় ফুটবলার হলেন মেসি।
বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হয়েছিল নতুন রাজাদের অভিষেকের গল্প দিয়ে। দিন শেষ হলো পুরোনো সম্রাটের ঘোষণায়। লিওনেল মেসি বুড়ো হননি।
তিনি শুধু ফুটবলের অন্য আরেকটি ধাপে উঠে গেছেন— যেখানে পা একটু ধীর হয়, কিন্তু চোখ আরও দ্রুত দেখে; শরীর একটু ক্লান্ত হয়, কিন্তু মস্তিষ্ক ম্যাচের প্রতিটি দৃশ্য কয়েক মিনিট আগেই পড়ে ফেলে।
এবং এটাই হয়তো সবচেয়ে ভয়ংকর মেসি। কারণ তরুণ মেসিকে হয়তো থামানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু যে মেসি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই ম্যাচ পড়ে ফেলতে পারে, তাকে থামানো রীতিমতো অসম্ভব।