
ইয়ান দিয়োমান্দে
বিশ্বকাপের আলোয় সাধারণত আমরা গোল দেখি, ট্রফির স্বপ্ন দেখি, তারকাদের উল্লাস দেখি। কিন্তু কখনও কখনও ফুটবল আমাদের এমন কিছু গল্প শোনায়, যা যেকোনো স্কোরলাইন কিংবা পরিসংখ্যানের চেয়েও অধিকতর শক্তিশালী।
কখনও কখনও ফুটবল শোনায় জীবনের গল্প, হয়তো জীবনের চাইতেও খানিকটা বেশি।
আইভরি কোস্টের ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ইয়ান দিয়োমান্দে এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে লিখেছেন একটি চিঠি। যা কোনো কোচের উদ্দেশ্যে নয়, কোনো সতীর্থের জন্য ও নয়, চিঠিটি লেখা হয়েছে তাঁর মৃত ছোট বোন রক্সানের জন্য।
আর সেই চিঠি পড়লে নিছক চিঠি নয়, মনে হতে পারে, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা এক পরিবারের ইতিহাস।
আবিদজানে দিয়োমানের শৈশব কাটে। এবং তাদের বাড়িতে থাকতো প্রায় জনা পঁচিশ মানুষ। একটিমাত্র টেলিভিশন। কেউ সিনেমা দেখতে চায়, কেউ নাটক। আর ছোট্ট ইয়ান অপেক্ষা করতো সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার।
রাত গভীর হলে সে চুপিচুপি টিভির সামনে বসতো। শব্দ নামিয়ে আনতো মাত্র দুই দাগে। অন্ধকার ঘরে ফুটবল দেখতো আর দেখতো স্বপ্ন । একদিন সেই স্বপ্ন যে তাকে বিশ্বকাপে নিয়ে আসবে, তা কি তখন ও সে জানতো?
তাদের কাছে ধনী-গরিব এর কোনো ধারণা ছিল না। ছিল শুধু আনন্দ।
একটি নকল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড জার্সির পেছনে কালো মার্কার দিয়ে রক্সানা লিখে দিয়েছিলো- “Ronaldo 7″। সেটিই ছিল তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জার্সি।
দারিদ্র্যের গল্প অনেকেই বলেন। কিন্তু ইয়ানের স্মৃতিতে দারিদ্র্য এসেছে অন্যভাবে। নয় বছর বয়সে বাড়ি থেকে দূরে ফুটবল একাডেমিতে গিয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। ক্ষুধা ছিল নিত্যসঙ্গী।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, একসময় তারা গ্রামের দোকান থেকে আলু চুরি করতেন।
তাদের ভাষায় সে আলু চুরিই ছিল “ব্যাংক ডাকাতি”। দুজন দোকানদারকে ব্যস্ত রাখতো তাঁরা, আর বাকিরা দৌড়ে নিয়ে যেতো দুটো আলু।আজও সেদ্ধ আলু আর সামান্য তেল তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। কারণ সেই স্বাদই যেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাঁর ক্ষুধার্ত অথচ স্বপ্নে ভরা দিনগুলোয়।
ফুটবল বুট পাওয়ার আগেও সে স্বপ্ন দেখতো বিশ্বসেরা হবে। প্রথমবার যখন সত্যিকারের বুট পেলো , সেই বুট পায়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলো ইয়ান। তবুও আজও দেশে ফিরলে সাদা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে ফুটবল খেলে সে। শেকড়কে ভুলে না যাওয়ার এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার।
কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইয়ান নন। তিনি রক্সান। ছোট বোন।
যে কিনা ভাইয়ের ওপর এমন বিশ্বাস রেখেছিলো, যা পৃথিবীর আর কেউ রাখেনি। বন্ধুরা অনুশীলন ছেড়ে দিলে রক্সান নাকি তাদের বকাঝকা করতো।
বলতো,
“কেন অনুশীলন বন্ধ করলে? ইয়ান তোমাদের গাড়ি কিনে দেবে না। নিজেদের জন্য নিজেদেরই কাজ করতে হবে।”
মাত্র দশ বছরের এক মেয়ে। কিন্তু যেন ভাইয়ের প্রথম এজেন্ট, প্রথম ম্যানেজার, প্রথম সমর্থক।
তারপর শুরু হয় প্রত্যাখ্যানের দীর্ঘ যাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া। ভাষা না বোঝার কষ্ট। দেশের জন্য মন কেমন করা আকুতি।
ইংল্যান্ড ও ইউরোপের নানা ক্লাবে ট্রায়াল দেওয়া। বারবার শুনতে হওয়া “না”। কখনও কারণও জানানো হয়নি। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। স্বপ্ন ভেঙে যায়। আফ্রিকায় ফিরে আসতে হয়। ইয়ান লিখেছেন, সেদিন তারা দুজন একসঙ্গে কেঁদেছিলেন।
কিন্তু রক্সান তখনও বিশ্বাস হারায়নি।
কয়েক সপ্তাহ পর নতুন সুযোগ আসে। আর সেই কান্না বদলে যায় আনন্দাশ্রুতে।
তারপর আসে সেই অংশ, যেখানে ফুটবলের গল্প থেমে যায়।
শুরু হয় শোকের গল্প।
রক্সান আর বেঁচে নেই।
চিঠিতে ইয়ান লিখেছেন—
“তখনও আমার অনুভূতি ছিল। এখন আর কিছু অনুভব করি না। তুমি মারা যাওয়ার পর আমি যেন শূন্য হয়ে গেছি।”
একজন তরুণ ফুটবলারের এই স্বীকারোক্তি বিশ্বকাপের সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলোর একটি।
আমরা মাঠে যে হাসি দেখি, তার পেছনে কত না অদৃশ্য শোক লুকিয়ে থাকে।
তবুও তিনি খেলেন। কারণ মাঠই এখন তার আশ্রয়। মাঠেই তিনি বোনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
মাঠেই তিনি অনুভব করেন, রক্সান এখনও কোথাও আছেন। হয়তো স্টেডিয়ামের আলোয়।
হয়তো গ্যালারির অদৃশ্য কোনো কোণে। হয়তো আকাশের ওপারে।
চিঠির শেষ অংশে ইয়ান লিখেছেন—
“তুমি সবসময় বলতে আমি ক্রিশ্চিয়ানোর চেয়েও ভালো হতে পারি। যদি কখনও তার সঙ্গে দেখা হয়, তোমার পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা জানাবো।”
এরপর আসে এক প্রতিজ্ঞা।
জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা এক বাক্য-
“আমি প্রমাণ করবো, তুমি ঠিক ছিলে। আর যদি না পারি, চেষ্টা করতে করতেই মরে যাবো।“
বিশ্বকাপে কোটি কোটি মানুষ তারকা খোঁজে। কেউ খোঁজে ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু ইয়ান দিয়োমান্দের গল্প মনে করিয়ে দেয়, ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো ট্রফি নয়, খ্যাতি নয়, অর্থও নয়।
সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের অবিচল বিশ্বাস।
রক্সান আজ নেই।
কিন্তু তার বিশ্বাস এখনও দৌড়াচ্ছে। প্রতিটি স্প্রিন্টে।প্রতিটি ড্রিবলে। প্রতিটি গোলের স্বপ্নে। আর সেই কারণেই হয়তো ইয়ান দিয়োমান্দে আজও একা নন। তার সঙ্গে এখনও দৌড়াচ্ছে একটি ছোট্ট কণ্ঠ—
“আমার ভাই একদিন পৃথিবীর সেরা হবে।“