
সিয়াটলে আমেরিকান ভক্তদের জয়োল্লাস
সিয়াটলের আকাশে শুক্রবার বিকেলে শোনা গেছে জয়গান; শোনা গেছে স্বপ্ন নাকি খোয়া যায়নি। জন্মেছে নতুন বিশ্বাস। বিশ্বকাপ শুরুর আগে যে যুক্তরাষ্ট্র দলটিকে নিয়ে সংশয় ছিল, যাদের প্রস্তুতি নিয়ে সমালোচনা ছিল, সেই দলই এখন দুই ম্যাচ শেষে নকআউট পর্বের টিকিট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—তারা এটি করেছে তাদের সবচেয়ে বড় তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ-কে ছাড়াই।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় তাই তিন পয়েন্টের কল্পগাঁথা নয়, একটি দলের পরিণত হয়ে ওঠার গল্প। যুক্তরাষ্ট্র দলটাই এমন। একক কারো কারিকুড়ি নাই। বিশ্বকাপের শুরুতে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ৪-১ গোলের ঝলমলে জয়কে অনেকে হয়তো আবেগের বিস্ফোরণ ভেবেছিলেন। ঝড়ে বক মারা গেছে বৈকি ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এই জয় প্রমাণ করলো- অঘটন নয় -পরিকল্পিত উত্থান।
আত্মঘাতী গোল, তবে প্রাপ্য আমেরিকারই
ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিটে আসে প্রথম গোল। স্কোরশিটে গোলদাতার নাম অস্ট্রেলিয়ার ক্যামেরুন বারজেস। কিন্তু বাস্তবে গোলটির স্থপতি ছিলেন ফোলারিন বালোগুন।
বাম প্রান্ত দিয়ে দৌড়ে গিয়ে বালোগুন যে বলটি বক্সে পাঠিয়েছিলেন, সেটি ঠেকাতে গিয়ে বার্জেস নিজের জালেই জড়িয়ে ফেলেন। টানা দুই বিশ্বকাপ ম্যাচে প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোল থেকে সুবিধা পাওয়া ইতিহাসের প্রথম দল হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।
তবে নিছক ভাগ্য বললে ভুল হবে। কারণ দুই ম্যাচেই আত্মঘাতী গোল এসেছে আমেরিকান আক্রমণের অসহনীয় চাপের ফলে।
বালোগুন পরে বলেছিলেন, “আমি যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারি যাতে প্রতিপক্ষ ভুল করে, তাহলে সেটিও আমার কাছে গোলের মতোই মূল্যবান।”
এই কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে নতুন আমেরিকার দর্শন—গোলদাতা কে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো দলকে এগিয়ে নেওয়া।
পোচেত্তিনোর দাবার চাল
পুলিসিচের কাফ ইনজুরির কারণে অনেকেই ভেবেছিলেন আমেরিকার আক্রমণভাগ দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু কোচ মরিশিও পোচেত্তিনো অন্য পরিকল্পনা করেছিলেন।
তিনি একসঙ্গে নামালেন রিকারদো পেপি এবং বালোগুনকে। দুই স্ট্রাইকারের উপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার পাঁচজনের রক্ষণভাগকে ক্রমাগত ব্যস্ত রাখে। পোচেত্তিনোর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। তিনি কোনো একক পরিকল্পনায় আটকে নেই। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী বদলে যাচ্ছে কৌশল, বদলে যাচ্ছে আক্রমণের ধরন।
বিশ্বকাপে সফল হতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, অভিযোজনক্ষমতাও লাগে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র সেই পরীক্ষায় সফলভাবেই পাস করছে।
বাবার স্টেডিয়ামে ছেলের ইতিহাস
ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে বিরতির ঠিক আগে। একটি ফ্রি-কিক থেকে বল উড়ে যায় আকাশে। ডিফেন্ডারদের ভিড়ের মধ্যে উঠে হেড করেন তরুণ অ্যালেক্স ফ্রিম্যান। লাইনসম্যান অফসাইডের পতাকা তুলেছিলেন, কিন্তু VAR জানালো- গোল বৈধ।
স্কোরলাইন হয়ে গেল ২-০।
এই গোলের গুরুত্ব শুধু ম্যাচের প্রেক্ষাপটে নয়। ফ্রিম্যানের বাবা আন্তোনিও ফ্রিম্যান একসময় NFL-এ খেলতেন এবং এই একই সিয়াটল স্টেডিয়ামে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছিলেন।
এবার সেই স্টেডিয়ামেই ছেলের বিশ্বকাপ গোল।
ফ্রিম্যানের ভাষায়, “এটা আমাদের পরিবারের জন্য এক পূর্ণচক্রের মুহূর্ত। বাবা নিজের পথে মহান হয়েছেন, আমিও নিজের পথে কিছু করে যেতে চাই।”
বিশ্বকাপে প্রায়ই দেখা যায় পরিসংখ্যান। কিন্তু এমন গল্পগুলোই তো টুর্নামেন্টকে মানুষের করে তোলে।
প্রথম ম্যাচে আক্রমণ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বেশি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ২০ মিনিটে আলোচনায় আসে রক্ষণভাগ।
অস্ট্রেলিয়া যখন মরিয়া হয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সামনে দাঁড়ান ক্রিস রিচারডস, টিম রিম এবং টাইলার অ্যাডামস।
একাধিক ব্লক, ক্লিয়ারেন্স এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকলে তারা নিশ্চিত করেন যে টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো কোনো গোল হজম না করেই মাঠ ছাড়বে যুক্তরাষ্ট্র।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখা দলগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে—তারা শুধু গোল করতে জানে না, গোল ঠেকাতেও জানে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র সেই দ্বিতীয় পরিচয়টিও দেখিয়ে দিল।
পরিসংখ্যানও আমেরিকার পক্ষে কথা বলছে।
১৯৩০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে টানা দুটি ম্যাচ জিতলো যুক্তরাষ্ট্র। ৯৬ বছরের অপেক্ষার পর এমন সূচনা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। আরও বড় বিষয় হলো—এই দলটি খেলছে আত্মবিশ্বাস নিয়ে, দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে, এবং ধীরে ধীরে নিজেদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করছে।
অ্যালেক্স ফ্রিম্যানের একটি কথাই হয়তো পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা:
“আমাদের আত্মবিশ্বাসের পারদ এবার অনেক ওপরে। প্রশ্নটা আর জেতা নয়, প্রশ্নটা হলো আমরা আরও কতটা দিতে পারি।”
বিশ্বকাপের ইতিহাস শেখায়, গ্রুপ পর্বের সাফল্য সবসময় শেষ পর্যন্ত গৌরব এনে দেয় না। কিন্তু এটাও সত্য যে বড় কিছু অর্জনের আগে একটি দলকে নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করতে হয়।
দুই ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ভক্তরা এখন আর শুধু নকআউটের কথা ভাবছেন না। তারা আরও দূরের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
পুলিসিচ নেই, তবুও জয়।
চাপ আছে, তবুও নিয়ন্ত্রণ।
প্রত্যাশা বাড়ছে, তবুও স্থিরতা।
সিয়াটলের বিকেলে তাই শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারায়নি যুক্তরাষ্ট্র, ঘরের মাঠের দর্শকদের জন্য দারুণ উপভোগ্য ৯০ মিনিট উপহার দিয়ে তারা হয়তো নিজেদের দীর্ঘদিনের সংশয়কেও হারিয়েছে।
আর বিশ্বকাপে প্রায়ই দেখা যায়—যে দল নিজেদের বিশ্বাস করতে শেখে, ইতিহাসও একসময় তাদের বিশ্বাস করতে শুরু করে।