
মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
এই পরিস্থিতির মাঝেই একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি মূলত আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধ চুক্তিকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নতুন করে বেগবান করেছে। এর আগে, পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে লেবাননে চলমান সংঘাত বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সংঘাত থামাতে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য জটিল আঞ্চলিক সমস্যা নিরসনে চলতি সপ্তাহেই দুই পক্ষ একটি ‘১৪ দফার সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর করেছিল। এই সমঝোতার আওতায় বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর বাতিল করেছিলেন। তবে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এখন সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, শনিবারই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সুইজারল্যান্ড পৌঁছানোর কথা রয়েছে। দুই পক্ষের এই তোড়জোড় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কারিগরি আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমেরিকা ও কাতারের মধ্যস্থতায় এবং ইরানের পরোক্ষ সহায়তায় লেবাননে এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। গত শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই যুদ্ধবিরতির খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ আক্রমণ না করলে তারাও হামলা চালাবে না, তবে দক্ষিণ লেবাননে দখলকৃত সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন থাকবে।
সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক পাহাড়ি রিসোর্টে কারিগরি আলোচনার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তির মূল শর্তই হলো— আমেরিকা, ইরান এবং তাদের মিত্রদের সব ফ্রন্টে (লেবাননসহ) অবিলম্বে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। তবে এই আলোচনায় অংশ না নেওয়া ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নয়।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এক ফোনালাপে সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তির কোনো লঙ্ঘন হলে, বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি ভাঙা হলে তার জন্য পুরোপুরি দায়ী থাকবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর লেবানন এই আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানালেও বলেছেন, এই উত্তেজনা একটি ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারবে না। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননের প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপকালে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিয়ে একটি ‘পূর্ণ সার্বভৌম’ লেবানন রাষ্ট্রের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সাথে আগামী ২৩ থেকে ২৫ জুন ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন পরবর্তী দফার বৈঠকের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও লেবাননে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। তবে চলতি সপ্তাহে চুক্তি সই এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, শত শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করা এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে এতে।
এদিকে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পকে নিজ দলের (রিপাবলিকান) অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন কি না।
সমালোচনার জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, এই যুদ্ধ ইরানকে ধ্বংস করে দিয়েছে! আমরা কোনো হতাশাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে ওদের সাথে বসিনি, ইরানই বাধ্য হয়ে বসেছে। ওরা শেষ হয়ে গেছে! আমরা শুধু ৬০ দিনের সময়সীমাটা পার করছি। মনে রাখবেন, ওরা কিন্তু এখনই কোনো টাকা পাচ্ছে না, ১০ সেন্টও না!