
জমকালো প্রথম সপ্তাহ- ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬
স্পেনকে রুখে দেওয়া কেপ ভার্দে, ইকুয়েডরের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো কুরাসাও, আর গোলের ইতিহাসে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছুঁয়ে ফেলা লিওনেল মেসি—২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহেই ফুটবল মনে করিয়ে দিল, এই খেলায় অসম্ভব বলে কিছু নেই।
ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কী? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে বিশেষ কিছু মুহূর্তে, যেমন -ছোট্ট কোনো দেশ, যার নাম অনেকেই টুর্নামেন্ট শুরুর আগে শোনেননি, এমন কেউ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে যায় সদর্পে। আবার কখনও সেই একই মঞ্চে নিজের মহত্ত্ব – অমরত্ব আরও একবার প্রতিষ্ঠা করেন ইতিহাসের সেরা তারকারা।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহ যেন এই দুই বিপরীত ধারার এক অপূর্ব মিলনমেলা। একদিকে রূপকথার নায়ক হয়ে ওঠা কেপ ভার্দে ও কুরাসাও, অন্যদিকে গোলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই একটি করে ‘সিন্ডরেলা’ গল্প জন্ম নেয়। কিন্তু এবারের প্রথম সপ্তাহেই যেন সেই গল্পের সংখ্যা একাধিক।
আটলান্টার স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল কেপ ভার্দে। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি। ফিফা র্যাঙ্কিং, অবকাঠামো কিংবা খেলোয়াড়ের বাজারমূল্য—সবকিছুতেই তারা স্পেনের তুলনায় বহু গুণ পিছিয়ে। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও হিসাবের খাতা মানে না।
৯০ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে তখনও ঝুলছে ০-০। স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেইভ করে ম্যাচসেরা হওয়ার পর তার চোখে জল ছিল। ড্রয়ের আনন্দ নয়; একটি জাতির স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
কিন্তু কেপ ভার্দের গল্প শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি বিস্ময় উপহার দেয় কুরাসাও।
ক্যারিবীয় সাগরের ছোট্ট দ্বীপদেশটি ইকুয়েডরের বিপক্ষে এমন এক রক্ষণাত্মক লড়াই উপহার দেয়, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে। গোলরক্ষক এলোয় রুম যেন একাই একটি দুর্গে পরিণত হন। ম্যাচজুড়ে ১৫টি সেইভ করে তিনি ইকুয়েডরের আক্রমণভাগকে হতাশ করেন। শেষ বাঁশি বাজার পর কুরাসাওয়ের খেলোয়াড়দের উল্লাস দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তারা কোনো শিরোপা জেতেনি; একটি ড্র-ই তাদের কাছে ছিল বিজয়ের সমান।
এই দুই ম্যাচ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ শুধু তারকাদের মঞ্চ নয়; এটি স্বপ্নবাজদেরও মঞ্চ।
তবে স্বপ্নবাজদের গল্পের মাঝেও আলো কেড়ে নিতে জানেন কিংবদন্তিরা।
৩৯ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছেও লিওনেল মেসি যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চলেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক শুধু আর্জেন্টিনাকে জয়ই এনে দেয়নি, তাকে পৌঁছে দিয়েছে আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলকে। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬, যা জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের সর্বকালের রেকর্ডের সমান।
মেসির ক্যারিয়ার এমনিতেই অসংখ্য রেকর্ডে ভরপুর। তবুও বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি নতুন অর্জন যেন আলাদা আবেগ বহন করে। কারণ এখানেই তৈরি হয় চূড়ান্ত উত্তরাধিকার।
অন্যদিকে, ইতিহাসের পেছনে ছুটছেন আরেক মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে।
ফ্রান্সের জার্সিতে তার জোড়া গোল, বিশেষ করে শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত গোলটি, আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাকে এই প্রজন্মের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ড বলা হয়। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন ১৪। বয়সের হিসেবে তিনি এখনও নিজের সেরা সময়ের অনেকটা পথ বাকি রেখেছেন। ফলে ক্লোসে কিংবা মেসির রেকর্ড যে একদিন তার নাগালের মধ্যে চলে আসবে, তা আর অবাস্তব মনে হচ্ছে না।
বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহ শেষ হয়েছে মাত্র। সামনে রয়েছে আরও বহু ম্যাচ, আরও বহু নাটক, আরও বহু অপ্রত্যাশিত মোড়। কিন্তু এই কয়েকদিনেই ফুটবল আমাদের আবার শিখিয়েছে একটি পুরোনো সত্য।
এই খেলায় অর্থ, শক্তি কিংবা খ্যাতি গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাস।
সেই বিশ্বাস নিয়েই কেপ ভার্দে স্পেনকে রুখে দেয়। সেই বিশ্বাস নিয়েই কুরাসাও ইকুয়েডরের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই মেসি ও এমবাপ্পের মতো কিংবদন্তিরা বয়স ও সময়ের বিরুদ্ধে নিজেদের গল্প লিখে চলেন।
বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহ গোলের গল্প, গোল রুখে দেবার গল্প; স্বপ্ন, সাহস এবং ইতিহাসের সঙ্গে লড়াই করার গল্প।