
বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি দক্ষ, জ্ঞাননির্ভর ও পেশাদার মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর। শিক্ষা, প্রশাসন, স্বাস্থ্য, বিচার, গণমাধ্যম, গবেষণা ও ব্যবসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেশাজীবীদের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের পেশাজীবী সমাজের একটি অংশ ক্রমশ পেশাভিত্তিক পরিচয়ের পরিবর্তে দলীয় পরিচয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়। ফলে স্বভাবতই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—দলমুখী পেশাজীবীদের কর্মকাণ্ড কি রাজনৈতিক আদর্শের বহিঃপ্রকাশ, নাকি ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের কৌশল?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিশ্বাস রাখা কোনো অপরাধ নয়। একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা আমলারও রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু যখন পেশাগত দায়িত্ব, নৈতিকতা ও দক্ষতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল উদ্দেশ্য হারাতে শুরু করে। তখন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে একটি অঘোষিত বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—যোগ্যতার পাশাপাশি বা কখনও কখনও যোগ্যতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক অবস্থান।
বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুশাসন সূচকের গবেষণায় বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ওপর। যেখানে দলীয় বিবেচনা বেশি প্রভাব ফেলে, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান, সেবার গুণগত মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শক্তি হলো মুক্তচিন্তা, গবেষণা এবং একাডেমিক উৎকর্ষতা। কিন্তু যখন শিক্ষক সমাজ রাজনৈতিক বিভাজনে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন একাডেমিক আলোচনা ও গবেষণার পরিবর্তে দলীয় অবস্থান অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক পদায়ন কিংবা গবেষণা সুযোগের ক্ষেত্রেও দলীয় পরিচয়ের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ফলে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষক বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য চলে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই আর দেশে ফিরে আসছেন না। অর্থনীতিবিদরা একে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচার হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মেধা ধরে রাখতে না পারা অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। মেধাবীরা তখনই দেশে থাকতে আগ্রহী হন, যখন তারা বিশ্বাস করেন যে দক্ষতা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। একটি পেশাদার সিভিল সার্ভিসের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নিরপেক্ষতা, দক্ষতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার। কিন্তু যখন কর্মকর্তারা মনে করেন যে কর্মদক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য পদোন্নতির ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর, তখন প্রশাসনের ভেতরে স্বাভাবিক কর্মপ্রেরণা কমে যায়। দক্ষ কর্মকর্তারা পিছিয়ে পড়েন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে তৈরি হয় এক ধরনের নীরব অসন্তোষ।
একই সঙ্গে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষক সমিতি, চিকিৎসক সংগঠন, আইনজীবী সমিতি, প্রকৌশলী সংগঠন কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবী ফোরাম অনেক সময় পেশাগত স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে পেশাজীবী সংগঠনগুলো তাদের মূল দায়িত্ব—পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বার্থ রক্ষার কাজ থেকে দূরে সরে যায়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রতিযোগিতার মূল উপাদান হচ্ছে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা। বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলে তাকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে। কিন্তু একটি সমাজ যদি মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে পুরস্কৃত করে, তাহলে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।
সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ একবার বলেছিলেন, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং তার দক্ষ মানুষ। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং নর্ডিক দেশগুলোর সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারণ হলো মেধাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকলেও পেশাগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও সক্ষমতাই প্রধান বিবেচ্য।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। তারা দেখতে চায় এমন একটি সমাজ, যেখানে সাফল্যের মানদণ্ড হবে যোগ্যতা, সততা এবং কর্মদক্ষতা। যদি তারা বারবার দেখে যে রাজনৈতিক পরিচয়ই উন্নতির প্রধান সোপান, তাহলে মেধার প্রতি তাদের আস্থা কমে যাবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক ন্যায্যতার জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের উন্নয়নের আগামী ধাপ নির্ভর করবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর। আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তখনই, যখন সেখানে ব্যক্তি নয়, নীতি; আনুগত্য নয়, যোগ্যতা; দল নয়, দেশ—প্রাধান্য পায়।
তাই সময় এসেছে পেশাজীবী সমাজের আত্মোপলব্ধির। রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে, মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু পেশাগত দায়িত্বের জায়গায় দলীয় আনুগত্য স্থান নিতে পারে না। শিক্ষককে শিক্ষক, আমলাকে আমলা, চিকিৎসককে চিকিৎসক এবং গবেষককে গবেষক হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, সুশাসন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থে বাংলাদেশকে একটি মেধাভিত্তিক, দক্ষতানির্ভর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাজীবী সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি মেধাকে সম্মান করে, সেই জাতি এগিয়ে যায়; আর যে জাতি আনুগত্যকে যোগ্যতার উপরে স্থান দেয়, সে জাতি একসময় স্থবির হয়ে পড়ে।