
মহান গল্পগুলোর সমাপ্তি কখনোই কেবল শেষ বাঁশিতে লেখা হয় না
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। শুধু একটি নাম নয়, ফুটবল নামের মহাকাব্যের এক জীবন্ত অধ্যায়। যে শিশুটির শারীরিক সীমাবদ্ধতা একসময় তার স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই শিশুই আজ কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। যন্ত্রণাকে শক্তিতে, প্রতিবন্ধকতাকে প্রেরণায় আর অসম্ভবকে বাস্তবে পরিণত করার আরেক নাম লিওনেল মেসি। তাঁর বাঁ-পায়ের স্পর্শে ফুটবল কখনো হয়ে ওঠে কবিতা, কখনো চিত্রকর্ম, কখনো বা নিখাদ জাদু। বিশ্বকাপের মঞ্চেই ৩৯ বছরে পা দিলেন ফুটবলের এই মহাতারকা। শুভ জন্মদিন, লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম হয়েছিল লিওনেল মেসির। কিন্তু তাঁর গল্প কখনোই সাধারণ ছিল না। শৈশবেই ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের জটিলতা। চিকিৎসার ব্যয় ছিল পরিবারের সাধ্যের বাইরে। ফুটবলারের স্বপ্ন তখন যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। ঠিক সেই সময় ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয় স্পেনের বার্সেলোনা। একটি ছোট্ট ন্যাপকিন কাগজে লেখা চুক্তি বদলে দেয় ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ। বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়ায় শুরু হয় এক বিস্ময়বালকের বেড়ে ওঠা। সেখান থেকেই বিশ্ব প্রথম দেখতে শুরু করে এমন এক প্রতিভাকে, যিনি একদিন ফুটবলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবেন।
ছোটখাটো গড়ন দেখে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা শুরুতে তাঁকে গুরুত্বই দিতে চাইত না। কিন্তু তারা জানত না, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভবিষ্যৎ কিংবদন্তি। বল পায়ে মেসি যেন মাধ্যাকর্ষণকেও অস্বীকার করেন। ক্ষণিকের এক ড্রিবল, চোখের পলকে দিক পরিবর্তন, আর তারপর গোলের পথে একক অভিযাত্রা। তাঁকে থামাতে প্রতিপক্ষকে বারবার আশ্রয় নিতে হয়েছে কঠোর ফাউলের। বুটের আঘাত, ট্যাকলের নির্মমতা, শারীরিক লড়াই সবকিছু উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেছেন তিনি। ২০০৬ সালে জার্মানির বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে গোল করে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী বিশ্বকাপ গোলদাতাদের একজন হয়ে ওঠেন মেসি। সেই গোল ছিল কেবল শুরু। বিশ্বমঞ্চে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন শাসকের।
বহু বছর ধরে অধরা ছিল ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন বিশ্বকাপ। অসংখ্য সাফল্য, অগণিত গোল, অসাধারণ সব অর্জনের মাঝেও সেই একটি ট্রফির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে। অবশেষে ২০২২ সালের সেই মোহময় লুসাইল রাতে পূর্ণতা পায় ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর রূপকথা। বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে মেসি যেন জিতে নেন সমগ্র ফুটবল বিশ্বের হৃদয়।
ততদিনে বার্সেলোনার রঙিন অধ্যায় পেরিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন প্যারিসে। অনেকেই ভেবেছিলেন, কাতার বিশ্বকাপই হবে আকাশি-নীল জার্সিতে তাঁর শেষ মহাকাব্য। কিন্তু কিংবদন্তিরা হয়তো বিদায়ের সময় নিজেরাই ঠিক করেন। সবাইকে বিস্মিত করে মেসি আবারও নেতৃত্ব দিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে, পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে। বাছাইপর্বে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বয়স শুধু সংখ্যার আরেক নাম।
৩৯তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে হয়তো মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মহান গল্পগুলোর সমাপ্তি কখনোই কেবল শেষ বাঁশিতে লেখা হয় না। তিনি বহু আগেই একজন ফুটবলারের গণ্ডি অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন একটি অনুভূতি, একটি যুগ, একটি ইতিহাস।
একদিন হয়তো তিনি বুটজোড়া তুলে রাখবেন। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে। গ্যালারির গর্জন স্তব্ধ হবে। ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিও মিলিয়ে যাবে সময়ের স্রোতে। তবুও তিনি থাকবেন। ফুটবল ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়, কোটি মানুষের স্মৃতিতে, আর বিশ্বের প্রতিটি স্বপ্নবাজ শিশুর হৃদয়ে বারবার ফিরে আসবে একটি নাম- লিওনেল মেসি।
বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস