
নানি-দাদির মুখে রূপকথার গল্প শুনে বড় হয়নি— এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সেই গল্পের পাতায় থাকা ডানাওয়ালা, জাদুময় সুন্দর চরিত্র ‘পরী’ আজও মানুষের কল্পনার জগতে সমানভাবে বেঁচে আছে। শৈশবের স্মৃতি আর কল্পনার এই প্রিয় চরিত্রকে ঘিরেই প্রতি বছর ২৪ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক পরী দিবস।
শিশুদের কল্পনা ও রূপকথার জাদুময় সত্তা
রূপকথার গল্পে পরীকে সাধারণত জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী এক সুন্দর কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে পরীর গল্পের ধরন আলাদা হলেও প্রায় সব জায়গাতেই পরীকে রহস্যময় ও অলৌকিক সত্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শিশুদের কল্পনায় পরীরা থাকে ফুলের চারপাশে উড়ে বেড়ানো, নরম ডানার অধিকারী সুন্দর এক চরিত্র হিসেবে। তাদের সৌন্দর্য ও মায়াবী রূপ এতটাই জনপ্রিয় যে, মানুষের উপমা দিতেও অনেক সময় ‘পরীর মতো সুন্দর’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শিশুদের পোশাক, খেলনা থেকে শুরু করে নানা জিনিসেও দেখা যায় এই কাল্পনিক চরিত্রের ছবি।
যেভাবে এলো এই দিবস
পরী দিবসের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ইউরোপের পুরোনো লোককাহিনি ও কল্পনার সঙ্গে। বিভিন্ন অঞ্চলে পরীর উৎপত্তি নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। কোথাও তাদের বিদেহী আত্মা, কোথাও স্বর্গীয় সত্তা আবার কোথাও বা জাদুময় স্বাধীন প্রাণী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
তবে আধুনিক পরিমণ্ডলে এই দিবসটি জনপ্রিয় করার পেছনে বড় অবদান রয়েছে বিখ্যাত ফ্যান্টাসি লেখক ও শিল্পী জেসিকা গালব্রেথের। তিনি প্রথম ২৪ জুন তারিখটিকে আন্তর্জাতিক পরী দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন। জেসিকা গালব্রেথ মূলত তাঁর জাদুময় ও রহস্যময় ‘ফেয়ারি আর্ট’ বা পরীসংক্রান্ত চিত্রকর্মের জন্য বিশ্বজুড়ে বেশ পরিচিত ছিলেন। লোককাহিনি এবং রূপকথার এই চরিত্রগুলোকে যান্ত্রিক আধুনিক যুগেও মানুষের মনে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি একটি নির্দিষ্ট দিন উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন।
সেই ভাবনা থেকে তিনি তার নিজস্ব শিল্পকলা প্রদর্শনী, ফ্যান্টাসি লেখক ও প্রকাশকদের নেটওয়ার্ক এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ফ্যান্টাসি কমিউনিটিগুলোর মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট প্রচারণা চালান, যেখানে প্রতি বছর ২৪ জুনকে পরীদের জাদুময় দুনিয়া এবং শৈশবের কল্পনাকে উদযাপনের দিন হিসেবে বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তার এই ধারাবাহিক প্রচারণা ও পরীর ওপর আঁকা ছবিগুলোর জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী ফ্যান্টাসিপ্রেমীরা এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক পরী দিবস’ হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে। মূলত রূপকথা, লোককাহিনি ও ফ্যান্টাসি সংস্কৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখতে এবং যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে কল্পনার রাজ্যে একটুখানি ডুব দিতেই এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়।
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় গল্প জে এম ব্যারির ‘পিটার প্যান’-এর সঙ্গেও পরীর কাহিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেখানে ‘টিঙ্কার বেল’ নামক পরীকে শৈশব, আনন্দ ও কল্পনার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আধুনিক যুগে পরী দিবসের তাৎপর্য
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে রূপকথার গল্পের বই পড়ার চর্চা অনেকটাই কমে গেছে। তবুও পরী এখনো শিশু ও বড়—উভয়ের কল্পনার জগতে নিজের চিরচেনা জায়গাটি ধরে রেখেছে।
এই বিশেষ দিনে বিশ্বজুড়ে ফ্যান্টাসিপ্রেমীরা বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করেন। অনেকেই রূপকথার বই পড়েন, পুরোনো শৈশবের স্মৃতি মনে করেন এবং কল্পনার সেই জাদুময় জগতের সঙ্গে আবারও কিছুটা সময় কাটান। কারণ পরী শুধু একটি কাল্পনিক চরিত্র নয়, এটি আসলে মানুষের শৈশবের নির্মল আনন্দ, স্বপ্ন আর হারিয়ে যাওয়া কল্পনার এক অনন্য প্রতীক।
ভিজুয়াল স্টোরি