
ছবি: সিএনএন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে উদীয়মান সমঝোতা চুক্তিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি ‘বিপর্যয়কর মোড়’ হিসেবে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ এবং পরবর্তী সমঝোতা চুক্তি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি সম্পর্কে আস্থার সংকট আরও গভীর করেছে।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএসের জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আল-হাসান বলেন, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান যুদ্ধ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি বড় ধরনের নেতিবাচক মোড়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ধীরে ধীরে অঞ্চল থেকে সরে আসা এবং ইরানের দিকে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্পদের প্রবাহ বৃদ্ধি তেহরানকে আরও সাহসী করে তুলতে পারে।
তবে তিনি বলেন, যুদ্ধের চেয়ে একটি দুর্বল চুক্তিও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। এ কারণেই তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সমর্থন করেছে।
এ সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত সফর করছেন। যুদ্ধ চলাকালে এই দেশগুলোই ইরানের পাল্টা হামলার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
কুয়েতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কখনও তার উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করবে না। তিনি জানান, আলোচনার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে অংশীদার দেশগুলোর মতামত নেওয়া হবে।
তবে আঞ্চলিক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগের বড় কারণ হলো নতুন চুক্তিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা তাদের সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। অনেক উপসাগরীয় দেশের কাছে এসব বিষয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বেশি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল তদারকিতে ওমানের পাশাপাশি ইরানকে আনুষ্ঠানিক ভূমিকা দেওয়া। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি ও সমুদ্রপথে বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইরানের নজরদারির আওতায় চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও চুক্তির অংশ। ট্রাম্প প্রশাসন এ উদ্যোগে উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক অংশগ্রহণের কথা বললেও এখন পর্যন্ত সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানে না। অন্যদিকে কাতার আগ্রহ প্রকাশ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সামরিক অংশীদার খোঁজার প্রবণতাও বাড়ছে। বিশেষ করে তুরস্ক থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে কিছু উপসাগরীয় দেশ দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সঙ্গে একটি আঞ্চলিক অনাক্রমণ চুক্তির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর প্রতিরোধ সক্ষমতা ছাড়া এমন কোনো চুক্তি ইরানের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনে যথেষ্ট হবে না।
ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে একদিকে তাদের ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ খুঁজতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি শুধু তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্কই নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরব মিত্রদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎও নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।