
নাইকি ও এডিডাসের লোগো
মাঠে যেমন বিশ্বকাপের উত্তাপ বাড়ছে, তেমনি মাঠের বাইরেও জমে উঠেছে ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা দুই জায়ান্ট অ্যাডিডাস ও নাইকির প্রতিযোগিতা। প্রাথমিক বিক্রয় ও বাজার-তথ্য বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে বিক্রির দৌড়ে আপাতত প্রতিদ্বন্দ্বী নাইকির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে অ্যাডিডাস।
দুই প্রতিষ্ঠানই বিশ্বকাপকে ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজার অংশীদারিত্ব হারানো নাইকির জন্য এই টুর্নামেন্ট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগামী সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ প্রান্তিকের আয়-প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত খুঁজবেন।
বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পন্সর অ্যাডিডাস এবার ১৪টি জাতীয় দলের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল ম্যাচ বল সরবরাহ করছে। অন্যদিকে নাইকি ১২টি জাতীয় দলের কিট প্রস্তুত করছে, স্থানীয় স্ট্রিটওয়্যার ডিজাইনারদের সঙ্গে কাজ করছে এবং বিশ্বের পাঁচ হাজারের বেশি নিজস্ব ও পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্রে ফুটবলপণ্য নতুনভাবে সাজিয়েছে।
তবে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম সায়েন্সের মতে, দুই প্রতিষ্ঠানই বিশ্বকাপের সুফল পেলেও এখন পর্যন্ত তুলনামূলক বেশি লাভবান হচ্ছে অ্যাডিডাস।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মে মাসে অ্যাডিডাসের পোশাক বিক্রি ৭০ শতাংশ বেড়েছে এবং জুনেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে জার্সির ব্যাপক চাহিদাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নাইকির বিক্রিও বাড়ছে, তবে সেই বৃদ্ধির হার অ্যাডিডাসের তুলনায় কম। কারণ ভোক্তাদের চাহিদার সঙ্গে মানানসই পণ্যের সমাহার অ্যাডিডাসের কাছেই বেশি রয়েছে।
শুধু বিক্রিই নয়, ক্রেতাদের দোকানে উপস্থিতির ক্ষেত্রেও এগিয়ে অ্যাডিডাস। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্লেসার ডট এআই-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাডিডাসের স্টোরগুলোতে ক্রেতা উপস্থিতি ২০২৬ সালের গড়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে নাইকির স্টোরগুলোতে বৃদ্ধি ছিল মাত্র ১১ শতাংশ।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অ্যাডিডাসের স্টোরে ভিজিট বেড়েছে ১৬ শতাংশ, অন্যদিকে নাইকির ক্ষেত্রে তা কমেছে।
ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা জেডি স্পোর্টস জানিয়েছে, ১৫ জুন শুরু হওয়া সপ্তাহে তাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া দলীয় জার্সি ছিল অ্যাডিডাস প্রস্তুতকৃত মেক্সিকোর জার্সি। বিক্রির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল নাইকির তৈরি যুক্তরাষ্ট্র দলের জার্সি।
তবে সব দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই নাইকি। এলএসইজির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিক্রি হওয়া নাইকির ২৮ শতাংশ পণ্য প্রথম দুই সপ্তাহেই স্টকআউট হয়ে গেছে। অ্যাডিডাসের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ।
বুটের লড়াইয়ে সমানে সমান
বিশ্বকাপের মাঠেও ব্র্যান্ড দুটির লড়াই স্পষ্ট। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে একাদশে শুরু করা ৫২৮ খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৩২ জন নাইকির বুট পরে খেলেছেন। অ্যাডিডাসের বুট ব্যবহার করেছেন ২১৮ জন।
মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক ডেভিড সোয়ার্টজ বলেন, ‘ফিফার সঙ্গে অ্যাডিডাসের দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলেও দৃশ্যমানতার দিক থেকে নাইকি খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এটি ব্র্যান্ডের শক্তিমত্তার জন্য ইতিবাচক।’
বাজার হারাচ্ছে নাইকি
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়াসামগ্রী ব্র্যান্ড হলেও সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নাইকি। প্রতিষ্ঠানটির ডাঙ্ক ও এয়ার জর্ডানের মতো জনপ্রিয় পণ্যের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি অন ও ডেকার্সের মতো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থানও চাপ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ট্রেন্ড ও স্টাইলের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে না পারাও নাইকির একটি বড় দুর্বলতা।
ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ক্রীড়া জুতার বাজারে নাইকির অংশীদারিত্ব ২০২২ সালের ২৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে গত বছর ২২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
তারপরও সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় নাইকি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাডিডাস ও নাইকি পাল্টাপাল্টি সাফল্য পেয়েছে। এপ্রিল মাসে নির্দিষ্ট কিছু উয়েফা প্রতিযোগিতার বল সরবরাহের একচেটিয়া অধিকার পায় নাইকি, যা দীর্ঘ ২৫ বছর অ্যাডিডাসের দখলে ছিল। আবার একই মাসে অ্যাডিডাসের নতুন অতিহালকা জুতা পরে কেনিয়ার সেবাস্তিয়ান সাউয়ে ম্যারাথনে দুই ঘণ্টার বাধা ভেঙে আলোচনায় আসেন।
২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া নাইকির প্রধান নির্বাহী এলিয়ট হিল ফুটবল ও দৌড়ের মতো মূল খেলাগুলোতে নতুন করে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে সব চ্যালেঞ্জের পরও বাজারে এখনও সবচেয়ে বড় নাম নাইকি। ক্রীড়া জুতার বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব দ্বিতীয় স্থানে থাকা অ্যাডিডাসের প্রায় দ্বিগুণ।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘নাইকিই এখনও এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। তাই প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতাও তাদেরই সবচেয়ে বেশি।’
বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস