পরিবার, বন্ধুত্ব ও কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় সফট স্কিল প্রয়োজন
জীবনের অনেক ক্ষেত্রে আসল পার্থক্য গড়ে দেয় কিছু মানবিক ও আচরণগত দক্ষতা—যাকে বলা হয় সফট স্কিল। সম্পর্ক গড়ে তোলা, অন্যের অনুভূতি বোঝা, মতভেদ সামলানো বা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, এসব গুণ ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন দুটিকেই প্রভাবিত করে।
পরিবার, বন্ধুত্ব ও কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় এগুলি মানুষকে আরও পরিণত, স্থির ও সফল হতে সাহায্য করে।
জীবনের মান উন্নত করার ২৫টি সফট স্কিল এবং কর্মক্ষেত্রে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ তুলে ধরা হলো;
উন্মুক্ত মানসিকতা
ভিন্ন চিন্তা ও বিশ্বাসকে মেনে নেওয়া। সব মতের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয় কিন্তু ভিন্ন চিন্তা ও বিশ্বাসকে মেনে নেওয়া জরুরি। যারা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি মন দিয়ে শোনে, মানুষ তাদের সঙ্গেই বেশি স্বস্তি বোধ করে।
অফিসে নতুন কোনো সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রস্তাব এলে ‘আগেরটাই ভালো ছিল’ বলে নাকচ না করে, সেটি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার চেষ্টা করা।
নেটওয়ার্কিং
নেটওয়ার্কিং মানে হল নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সম্পর্ক তৈরি করা। এই পরিচয় থেকেই অনেক সময় বন্ধুত্ব, নতুন সুযোগ বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।
অফিসের কোনো সেমিনারে গিয়ে শুধু নিজের টেবিলে বসে না থেকে অন্যদের সাথে পরিচিত হওয়া এবং লিংকড-ইনে যুক্ত হওয়া।
প্রতিক্রিয়া দেওয়া ও গ্রহণ করা
আমরা অনেকেই নিজের মতামত দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি কিন্তু অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা সহজভাবে নিতে পারি না। উন্নতির জন্য গঠনমূলক সমালোচনা সহজভাবে নেওয়া।
বস যখন আপনার প্রেজেন্টেশনে ভুল ধরিয়ে দেন, তখন মন খারাপ না করে সেই পয়েন্টগুলো নোট করে পরবর্তী কাজে উন্নতি করা।
যোগাযোগ দক্ষতা
কথা বলার বা বার্তা পাঠানোর আগে একটু ভেবে নেওয়া দরকার—যা বলতে চান, তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে কিনা। অস্পষ্ট যোগাযোগ সম্পর্ক ও কাজের গতি কমায়।
সহকর্মীকে ইমেইল করার সময় শুধু “কাজটা করে দিয়েন” না লিখে, নির্দিষ্ট ডেডলাইনসহ বুঝিয়ে বলা।
উপলব্ধিশক্তি অনেক সময় কেউ স্পষ্টভাবে কিছু না বললেও আমরা যদি পরিস্থিতি বুঝতে পারি, তাহলে যোগাযোগ সহজ হয় এবং ভুল বোঝাবুঝি কমে। এই দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগ দিয়ে শোনা, পর্যবেক্ষণ করা এবং বলার আগে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
মিটিংয়ে ক্লায়েন্টের চেহারার অভিব্যক্তি দেখে বুঝে নেওয়া যে তিনি আপনার প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন এবং সেই অনুযায়ী কথা ঘুরিয়ে নেওয়া।
আত্মনিয়ন্ত্রণ আত্মনিয়ন্ত্রণ হল নিজের আবেগ ও আচরণকে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতা। হঠাৎ রাগ, হতাশা বা তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়।
জুনিয়রের কোনো অপেশাদার আচরণে প্রচণ্ড রাগ উঠলেও অফিসে সবার সামনে তাকে অপমান না করে আড়ালে ডেকে বুঝিয়ে বলা।
সততা ও নৈতিকতা দীর্ঘদিন ভাল সম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম ভিত্তি হল সততা ও নৈতিকতা। কথাবার্তা ও কাজে সৎ থাকলে অন্যদের জন্য আপনার ওপর ভরসা করা সহজ হয়।
নিজের ভুলের কারণে কোনো লস হলে তা লুকিয়ে না রেখে ম্যানেজমেন্টের কাছে স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া।
ভদ্রতা
ভদ্রতা ছোট একটি বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব বড়। সম্মানজনকভাবে কথা বলা, ধন্যবাদ জানানো বা প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়ার মত আচরণ সম্পর্ককে সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক করে।
সহকর্মী আপনাকে একটু সাহায্য করলেই তাকে একটি ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ ইমেইল বা মেসেজ পাঠানো।
দায়িত্ব বণ্টন
সব কাজ একা করা সব সময় সম্ভব নয়, আবার প্রয়োজনও হয় না। অনেক সময় লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যদের ওপর ভরসা করা এবং কাজ ভাগ করে দেওয়া জরুরি।
বড় একটি ইভেন্ট আয়োজনে সব কাজ নিজে না সামলে ক্যাটারিং, ডেকোরেশন ও ইনভাইটেশনের দায়িত্ব অন্যদের দেওয়া।
অন্যের প্রতি বিবেচনা আমরা সবাই চাই অন্যরা আমাদের সম্মান করুক এবং আমাদের অনুভূতির মূল্য দিক। ঠিক তেমনভাবেই অন্য মানুষের প্রতিও সেই মনোভাব দেখানোই হল বিবেচনাশীলতা।
নিজের জন্মদিনের পার্টি এমন সময় বা জায়গায় না করা যাতে অন্যের ঘুমের বা কাজের ব্যাঘাত ঘটে।
অধ্যবসায়
জীবনের পথে বাধা আসা স্বাভাবিক। অধ্যবসায় মানুষকে শেখায় যে সাময়িক বাধা মানেই শেষ নয় বরং সেই অভিজ্ঞতাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
কোনো সেলস টার্গেট তিনবার মিস করলেও চতুর্থবার নতুন কৌশল নিয়ে আবার শুরু করা।
চাপ নিয়ন্ত্রণ
জীবনে নানা কারণে চাপ আসতে পারে—কাজের দায়িত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। এগুলি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়, তবে সেগুলি সামলানোর দক্ষতা গড়ে তোলা জরুরি।
সামনে ডেডলাইন কিন্তু কাজ অনেক বাকি—এমন অবস্থায় প্যানিক না করে কাজগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে শেষ করা।
উদ্দীপনা
উদ্দীপনা হল কাজ বা জীবনের প্রতি আগ্রহ ও ইতিবাচক মনোভাব রাখা। যখন কেউ আনন্দ ও মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করে, সেই শক্তি আশেপাশের মানুষও অনুভব করতে পারে।
সোমবার সকালে আলসেমি না করে হাসিমুখে কাজ শুরু করা, যা পুরো টিমের কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়।
সম্পর্ক গড়ে তোলা, অন্যের অনুভূতি বোঝা, মতভেদ সামলানো বা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, এসব গুণ সকল ক্ষেত্রেই প্রভাব রাখে
ধৈর্য
সবকিছু সব সময় দ্রুত হয় না এটাই স্বাভাবিক। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নিয়ে বোঝে। কোনো কাজ করতে বা কাউকে বোঝাতে গিয়ে অপেক্ষা করতে হলে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
নতুন কোনো জুনিয়র কর্মী কাজ শিখতে দেরি করলে তাকে বারবার বিরক্ত না হয়ে সময় দিয়ে বুঝিয়ে বলা।
সহানুভূতি
নিজের অবস্থান থেকে একটু সরে অন্যের দিকটি ভাবলে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
কোনো সহকর্মী পারিবারিক সমস্যার কারণে কাজে ভুল করলে তাকে বকা না দিয়ে তার পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করা।
বন্ধুসুলভ আচরণ
অন্যদের সঙ্গে আমাদের আচরণই ব্যক্তিত্বের পরিচয় তুলে ধরে। আন্তরিকভাবে কথা বলা, হাসিমুখে অভিবাদন জানানো বা অন্যকে সম্মান দেওয়ার মত ছোট ছোট বিষয় মানুষকে সহজেই কাছে টানে।
প্রতিদিন অফিসে ঢুকে দারোয়ান থেকে শুরু করে বস পর্যন্ত সবাইকে হাসিমুখে সালাম বা অভিবাদন জানানো।
আত্মবিশ্বাস
নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা জীবনের অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। যখন কেউ নিজের দায়িত্ব নিতে পারে এবং প্রয়োজনে সামনে এগিয়ে আসে, তখন অন্যরাও তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে।
হুট করে বড় কোনো প্রেজেন্টেশন দেওয়ার সুযোগ এলে ভয় পেলেও সেটি গ্রহণ করা এবং নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করা।
সময়নিষ্ঠা
ব্যস্ততার মধ্যেও নির্ধারিত সময়কে গুরুত্ব দিলে কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা প্রকাশ পায়।
মিটিং ঠিক ১০টায় শুরু হলে ৯টা ৫৫ মিনিটে সেখানে পৌঁছে যাওয়া, যা আপনার দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করে।
সক্রিয়ভাবে শোনা
সক্রিয়ভাবে শোনা মানে শুধু শব্দ শোনা নয়, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা বোঝার চেষ্টা করা।
মিটিংয়ে কেউ কথা বলার সময় বারবার ফোনে না তাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে কথা শোনা এবং শেষে প্রশ্ন করা।
সহযোগিতা করার মানসিকতা
অনেকেই একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যা স্বাভাবিক। তবে জীবনের অনেক কাজই এমন, যেখানে একাধিক মানুষের চিন্তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।
প্রজেক্টে নিজের কাজ শেষ হলেও বিপদে পড়া অন্য সহকর্মীকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসা।
দ্বন্দ্ব সমাধান
মানুষ যেখানে আছে, মতভেদও সেখানে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হল, সেই পরিস্থিতিকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে।
টিমে আইডিয়া নিয়ে ঝগড়া শুরু হলে পক্ষ না নিয়ে সবাইকে নিয়ে মাঝামাঝি কোনো সমাধানে পৌঁছানো।
আত্মসচেতনতা
আত্মসচেতনতা মানে নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে বুঝতে শেখা।
আপনি জানেন যে আপনি রাগের মাথায় ভুল কথা বলেন, তাই উত্তেজিত অবস্থায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল না পাঠানো।
সমস্যা সমাধানের দক্ষতা
জীবনে ছোট-বড় সমস্যা আসবেই। গুরুত্বপূর্ণ হল, আমরা সেগুলির সামনে কীভাবে দাঁড়াই। যারা সমস্যাকে শুধু বাধা নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখে, তারা জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে।
প্রজেক্টের বাজেট কমে গেলে হতাশ না হয়ে কীভাবে কম বাজেটে মানসম্মত কাজ করা যায় সেই উপায় বের করা।
সৃজনশীল চিন্তা
সব সমস্যার সমাধান একভাবে হয় না। সৃজনশীল চিন্তা মানুষকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয় দেখতে এবং নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
মার্কেটিংয়ের পুরনো ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্নধর্মী কোনো ক্যাম্পেইন আইডিয়া নিয়ে আসা।
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা
মানুষের জীবন শুধু যুক্তি দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়েও পরিচালিত হয়। নিজের আবেগ বুঝতে পারা, সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষমতাই হল আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা।
বস রেগে থাকলে তাকে আরও পাল্টা যুক্তি না দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষা করা।