sentbe-top

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাঃ শেষ পর্ব

সউলের অলিতে গলিতে অনেক বিদেশীর সাথে দেখা হয়, কফির কাপে আড্ডা জমে খানিক, সে আড্ডা খুব তাড়াতাড়িই বিবর্ণ হয় ব্যস্ত জীবনের আহ্বানে। কোরিয়ার জীবন ব্যস্ত, কোরিয়ার জীবন দারুণ নিয়মানুবর্তিতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তদপুরি দক্ষিণ কোরিয়ার জীবন যাপনের মাহাত্ম্য এদেশের বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না। আসার আগে সবাই যে ভাবনা নিয়ে আসে এদেশে, সে ভাবনা আমূল বদলে যেতে বাধ্য কয়েক মাসের ব্যবধানে। আবার কোরিয়ান বন্ধু বান্ধবীদের সাথের আড্ডায় প্রায়ই নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনায় বসলে, ছবি দেখলে ওরা প্রায়শই মন্তব্য করে ষাট-সত্তর কিংবা আশির দশকের কোরিয়া। বিগত পঞ্চাশ-ষাট বছরে কিভাবে দক্ষিণ কোরিয়া উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে প্রকৌশলবিদ্যার মত ব্যবহার করেছে জাতি ও দেশ গঠনে সে রহস্যেরই জট খোলার প্রচেষ্টা থাকবে আজকের লেখায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আগের পর্ব পড়ে না থাকলে পড়ে নিতে পারেন

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা (প্রথম পর্ব)
দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা (দ্বিতীয় পর্ব)
দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা (তৃতীয় পর্ব)
দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা (চতুর্থ পর্ব)

দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন নিয়ে প্রায় সব আলোচনাতেই দারুণ প্রাধাণ্য পায় কোরিয়ান গণ-মানুষের শিক্ষার প্রতি অপার আগ্রহ। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো কোরিয়ান সমাজে শিক্ষার প্রতি এই আগ্রহ একেবারে হালের বা ‘নতুন ট্রেন্ড’ না। ১৮৬৬ সালে এক ফরাসী নৌ-সেনা কর্তকর্তা, যিনি গাংহোয়া-দো (Ganghwa-do) তে ক্যাথলিক নিধনের বিরুদ্ধে ফরাসী নৌ আক্রমণে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনি লিখেছেন

“We cannot help but admire this place and found something that really crushed our ego. Here, even the poorest have books in their homes. There is almost no one who is illiterate and the illiterate are looked down upon.”

কোরিয়ানদের মধ্যে শিক্ষার এই আগ্রহ প্রখর থেকে প্রখরতর হয় সময়ের কার্ণিস ধরে। কোরিয়া যুদ্ধের পৎ আমেরিকান প্রগতিশীল শিক্ষার সাথে মিশেল ঘটে কোরিয়ার স্থানীয় শিক্ষা ধারার। গণমানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ, দেশের সম্পদহীনতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কোরিয়া-যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বংশপ্রাপ্ত দেশ নিয়ে উত্তরণের উপায় খুঁজতে নীতিনির্ধারকগণ চোখ রাখেন শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে। দু দশকের মধ্যেই শিক্ষায় সে বিনিয়োগ ফেরত আসে হাজার গুণে। তৈরি হয় লক্ষ লক্ষ দক্ষ কোরিয়ান শ্রমিক ও পেশাজীবী; তারা কাজ শুরু করেন দেশে ও বিদেশে। দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শ্রম পেশাজীবীদের কঠোর পরিশ্রমে একদিকে যেমন দেশীয় চাহিদা পূরণে যেমন সক্ষম হয় কোরিয়া; অন্যদিকে বিদেশে কর্মরত শ্রম পেশাজীবীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও তাদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে দেশে গড়ে ওঠে রপ্তানিমূখী শিল্প। যুগোপযুগী শিক্ষা ও কোরিয়া তার পরবর্তী লক্ষ্য অর্জনে নিয়মিত সংস্কার করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেখা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সফল শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ক্ষেত্রে সফলতার মূল তিন কারণ হিসেবে বিশ্বে চিহ্নিত হয়ে এসেছে যে কারণসমূহ তা হলো –

  • সরকারের শক্তিশালী নেতৃত্ব
  • দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক
  • শিক্ষার ওপর জাতীয় ভাবে জোর দেওয়া এবং শিক্ষার জন্য মানুষের অপার আগ্রহ

সরকারের শক্তিশালী নেতৃত্ব

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার শিক্ষা খাতে অর্থের সরবরাহ সুনিশ্চিত রাখার জন্য একদিকে যেমন বাজেট এবং সামগ্রিক দেশীয় উৎপাদন (গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট – জিএনপি) এর একটা বড় অংশ বরাদ্দ রাখে, অন্যদিকে শিক্ষা ট্যাক্স ব্যবস্থা এর প্রচলন ঘটায় যাতে করে শিক্ষা খাতে যে কোন প্রয়োজনের সময় অর্থের অভাব না হয়। ১৯৭০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বাজেটের ১৭.৬ শতাংশ বরাদ্দ ছিলো শিক্ষা খাতের জন্য। পরবর্তীতে সে বরাদ্দ নিয়মিত ভাবে বেড়েছে – সেই সাথে উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষাক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিখন-শেখানো পদ্ধতির গুণগত মান।

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা বাজেটের বিবর্তন ১৯৭০ – ২০১২

কোরিয়ার শিক্ষা বাজেটের বিবর্তন

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার বিশ্লেষণে অন্যতম লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো উন্নতমানের শিক্ষাক্রম, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষার ব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়ন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ণ করার পর তা জাতীয় পর্যায়ে প্রচলণ (ইমপ্লিমেন্টেশন) শুরু হয় ১৯৫৫ সালে এবং ১৯৬২ সালে গিয়ে সমগ্র দেশে প্রচলিত হয়। এই সুদীর্ঘ সময় নিয়ে শিক্ষাক্রম প্রচলণের উদ্দেশ্য ছিলো এটা নিশ্চিত করা যে যেন সমগ্র দেশে শিক্ষার গুণগত মান সমান থাকে। সেই থেকে প্রতি পাঁচ-দশ বছর পর পর দক্ষিণ কোরিয়া নিয়মিতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করে আসছে যাতে করে দেশের শিক্ষা সব সময় যুগোপযোগী ও আধুনিক থাকে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা খাতে সফলতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এর শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চতকল্পে প্রচলিত মূল্যায়ণ ও পরিবীক্ষণ (এভালুয়েশন এন্ড মনিটরিং) ব্যবস্থা। শিক্ষা ক্ষেত্রে মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একদিকে যেমন দারুণ কঠিন ও অনমনীয় আপোষহীন, অন্যদিকে জবাবদিহিসতা দারুণভাবে বৈচিত্রময়। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা দারুণভাবে নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে একদিকে যেমন স্থানীয়, কাউন্টি ও আঞ্চলিক পর্যায়ের সকল শিক্ষা প্রশাসক ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত (বাৎসরিক) কঠিন পারফর্মেন্স এপ্রাইজাল এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এবং একইসাথে সকল শিক্ষকদের নিয়মিত পারফর্মেন্স এপ্রাইজাল হয় যার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে তাঁদেরকে। কোরিয়ানরা জাতিগতভাবেই কোন কাজে ব্যার্থ হওয়ার থেকে মৃত্যুই শ্রেয় মনে করে। তার ওপর বাড়তি এই প্রতিযোগিতা শিক্ষা ব্যবস্থা কে কেবল দারুণ দক্ষই করে তুলেনি, একই সাথে করে তুলেছে দারুণভাবে নিবেদিত। আর সারা দেশের প্রাণ সঞ্চারে নিয়োজিত এই নিবেদিত ব্যবস্থার রক্ত কণিকা হলো এদেশের নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকগণ।

দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক

দক্ষিণ কোরিয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শিক্ষকতা পেশা কে সবার কাছে দারুণ আকর্ষণীয় করে তোলে। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের (মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকা ৫%) শিক্ষার্থীকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ দানের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, শিক্ষা ক্ষেত্রে দারুণ ভালো করছে এমন সব দেশও সাধারণত মেধা তালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারী ১৫~৩০% শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় নিয়ে আসে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া এক্ষেত্রে কোন রকম ছাড় দেয় নি এবং এরই মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত দারুণ শক্ত হয়ে ওঠে কোরিয়ায়। শিক্ষকতা পেশায় যাবার জন্য টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে পাশ করা আবশ্যক করে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যে কোন কোহর্টের (এলাকাভিত্তিক দলের) মেধা তালিকার শীর্ষে অবস্থানকারী ৫~১০% শিক্ষার্থীই ভর্তি হতে পারতো। এরপর টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সবচেয়ে ভালো ফল করা গ্রাজুয়েটরাই হতে পারত শিক্ষক। টিচার্স ট্রেনিং কোর্স একদিকে যেমন নিয়মতান্ত্রিক, তেমনি বৈচিত্রময়। কোর্স ও মূল্যায়ণ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে করে সর্বোচ্চ মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরাই সেখানে ভালো করতে পারে।

মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তুলতে দেশের ক্রান্তিকাল কাটিয়ে ওঠার পর থেকেই শিক্ষকদের উচ্চ বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করা হয়। শিক্ষকতা জনপ্রিয় পেশা হয়ে ওঠার পেছনে পেশাগত নিরাপত্তা, উচ্চ বেতন ও সুবিধাদি, সামাজিক সম্মান ও প্রতিপত্তিকে কারণ হিসেবে দেখা হয়। সরকার ‘লাইফটাইম এমপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট’ (৬২ বছর বয়সে অবসর) এবং ‘স্পেশাল অ্যাক্ট অন দ্য ইমপ্রুভমেন্ট অব টিচার্স স্ট্যাটাস’ পাশের মাধ্যমে শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধাদি নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সেরা মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসে, তেমনি শিক্ষক রিটেনশন (পেশায় ধরে রাখার হার) হার ও শীর্ষে থাকে সবসময়।

অন্যান্য উন্নতদেশসমূহের (ওএসিডি কান্ট্রি) সাথে তুলনামূলক বিচারে দেখা যায় যে দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকদের বেতন অনেক বেশি। নিচে উন্নতদেশসমূহের শিক্ষকদের গড় বার্ষিক বেতনের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষক বেতনের তুলনা দেখানো হলো –

সূত্রঃ ওএসিডি রিপোর্ট (২০১১), এডুকেশন এট অ্যা গ্লান্স

উচ্চ বেতনের পাশাপাশি আকর্ষণীয় সুবিধাদি মেধা ও পারফর্মেন্স ভিত্তিক করায় শিক্ষকগণ পেশাগত সেবায় দারুণভাবে নিবেদিত হয়ে ওঠেন। একই সাথে সামাজিক ও জাতীয়ভাবে শিক্ষকদের নানা ভাবে সম্মান ও মর্যাদামুলক স্বীকৃতি নিয়মিতভাবে দেওয়ার ফলেও সত্যিকার অর্থেই প্রত্যেক শিক্ষক নিজের মেধা, সাধ্য ও কর্মদক্ষতার পুরোটা দিয়ে নিশ্চিত করার সর্বদা চেষ্টা করেন সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা প্রদানের।

শিক্ষার ওপর জাতীয় ভাবে জোর দেওয়া এবং শিক্ষার জন্য মানুষের অপার আগ্রহ

এ পর্বের শুরুতে এবং আগের পর্বগুলোতে বারবারই ঘুরে ফিরে দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের মধ্যে শিক্ষার প্রতি অপার আগ্রহের কথা এসেছে। এ বিষয়টি দারুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন মাইকেল সেথ তার ‘এডুকেশন ফিভার’ বইয়ে। জাতিগতভাবে শিক্ষাকেই একমাত্র ভাগ্য পরিবর্তন ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপায় বলেই বিশ্বাস করেন কোরিয়ানরা। আর সেজন্যই স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পদ বিক্রয় করে হলেও সন্তানকে শিক্ষা মইয়ের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন প্রত্যেক কোরিয়ান বাবা-মা।

পরিশেষে

দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৫০ এর দশকে ছিলো ক্ষুধায় কাতর, জরাগ্রস্থ, যুদ্ধবিদ্ধস্ত ও নিরক্ষর মানুষের দেশ। অথচ ২০১৭ সালে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা চতুর্থবারের মত (পর পর চার বছর) বিশ্বের সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৫৭ থেকে ২০১৭ – এই ৬০ বছরে কোরিয়ার পথচলা একেবারে রুপকথার মতো। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীলদেশের এ থেকে শেখার আছে অনেক অনেক কিছু। শুধু উন্নয়নশীল দেশসমূহই নয়, উন্নত দেশসমূহও নিয়মত দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে নিচ্ছে অনেক কিছু। পাঁচ পর্বের এই ধারাবাহিক থেকে প্রত্যাশা শুধু এটুকুই যে, একদিন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আমরা গড়ে তুলতে পারবো রুপকথার প্লটে – দারুণ সে শিক্ষা ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হবে আমাদের সন্তানেরা; গড়ে উঠবে লাখো মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্নের স্বদেশ।

sentbe-top