cosmetics-ad

ইউরোপের শেষ প্রান্তে একদিন

portugal

শনিবার বিকেলে লিসবনের বন্ধুদের সাথে কথা হচ্ছিল। ব্যস্ততার কারণে এ বছর কমিউনিটির অনেক অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। তাই সবার মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি ও বিরক্তির ছাপ লক্ষ্য করলাম। মূলত আমরা চারজন আলাপচারিতায় ছিলাম।

শুরুতে পরিচয় করিয়ে দেব মঈন উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। যিনি লিসবনে বিগত ১০ বছর ধরে আছেন এবং পর্তুগাল অভিবাসন অধিদপ্তরে কাজ করছেন। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ বলা চলে তাকে। তারপরে আছি আমি। দেশটিতে আছি প্রায় চার বছর হতে চললো। চাকরি আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বর্তমানে খানিকটা ব্যস্ত।

তানভীর আলম জনি ভাই বয়সে অনেক তরুণ। তাছাড়া মাত্র বছর খানেক আগেই পর্তুগালে এসেছেন। ইতোমধ্যে স্বল্প সময়ে এখানকার বৈধতা লাভ করেছেন। এবার আসা যাক আহসান হাবীব ভাইয়ের কাছে, যিনি মাত্র কয়েক মাস হলো পর্তুগালে এসেছেন। এখানে যারা বৈধ হতে আসে প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের কাজের জায়গায় যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়।

এমনিতেই কাজ পাওয়া মুসকিল নতুনদের। কেননা প্রয়োজনীয় কাগজ, ভাষা ও অভিজ্ঞতা না থাকা। তারপরও যদি কাজ পাওয়া যায় তা অনেক শর্ত সাপেক্ষ ও কম বেতনের। যেমন প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ৫ দিন কাজ করার বিধান থাকলেও নতুনদের অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয়। গড়ে বার থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৬ দিন যা স্বাভাবিক নিয়মের প্রায় দ্বিগুণ।

portugal

তাই বেচারা একধরনের ক্লান্তি, হতাশা ও বিষণ্নতার মধ্যে আছে। আহসান ভাইয়ের ছোট বেলার বন্ধু মঈন ভাই। মঈন ভাই বিষয়টি লক্ষ্য করছেন বেশকিছু দিন থেকে কিন্তু শান্ত্বনা ছাড়া কি বা আর করার আছে।

শনি-রবিবার মঈন ভাইয়ের অফিস থাকে না। আমি প্রস্তাব করলাম কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসলে কেমন হয়? সবাই জানাল রাতের মধ্যে আমাকে নিশ্চিত করবে তারা যাবে কি না। রাত দুইটায় একটি মেসেজ আসলো জনি ভাইয়ের মোবাইল থেকে আমরা যাচ্ছি বেড়াতে। সকাল দশটায় প্রস্তুত থাকতে। জনি ভাইয়ের বাৎসরিক ছুটি চলছে। আর মঈন ও আহসার ভাইয়ের সাপ্তাহিক ছুটি। আমি রাতে কাজ করি যা শেষ হয় সকাল দশটায়।

বসকে বলে আধাঘণ্টা আগে ছুটির ব্যবস্থা করলাম। সাড়ে নয়টায় আমি প্রস্তুত সারারাত কাজ করার পরেও। তাদের দেরী দেখে আমি সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। ঘড়ির কাঁটা দশটা, এগারোটা এবং বারটা ছুঁই ছুঁই। ইতোমধ্যে কয়েক দফা কথা হয়েছে কখন আসবে বা কোথায় আছে তা জানায় জন্য। আসছি আসছি বলে আড়াই ঘণ্টা শেষ।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজ আর যাব না কিন্তু আহসান ভাই নতুন মানুষ। লিসবনে আসার পরে প্রথম বেড়াতে বেরিয়েছেন তাই ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মনকে শান্ত করলাম। ইউরোপে সবাই ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে চলে কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এখানে থাকার পরেও আমাদের অনেক অভ্যাস ত্যাগ বা পরিবর্তন করতে পারিনি। তার মধ্যে সময়ের মূল্য দিতে না পারা হলো অন্যতম।

কাবো ডো রোকা পর্তুগালের লিসবন থেকে প্রায় পয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি পর্যটন স্থান যা ইউরোপ মহাদেশের সর্বশেষ ভূমি হিসেবে পরিচিত। এরপরে আটলান্টিক মহাসাগর এবং তারপরে আমেরিকা মহাদেশ। পাহাড় ও সমুদ্রের নৈসর্গিক এক লীলাভূমি যা উপভোগ করতে প্রতিদিন হাজারও পর্যটক ভিড় জমায় এখানে।

portugal

আমরা মনস্থির করলাম সেখানে যাব। লিসবন থেকে খুব সহজে প্রথমে ট্রেনে করে কাসকাইস বা সিন্ত্রা এবং তারপরে বাসে চড়ে সরাসরি এই কাবো ডো রোকা পৌঁছানো যায়। আমরা লিসবন থেকে প্রথমে ট্রেনে করে সিন্ত্রা পৌঁছায়। সিন্ত্রায়ের আশপাশে একের অধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। পেনা প্যালেস, মরিশ ক্যাসেল ও কাবো ডো রোকা অন্যতম।

সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম তৃতীয় স্থানটিতে যাব বলে। কারণ এটির অন্যরকম একটি আকর্ষণ আছে। ‘কাবো ডো রোকা’ ইউরোপের সর্ব দক্ষিণের শেষ ভূমি হিসেবে পরিচিত। অনেকে এই স্থানটিকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত বলে থাকে। কেননা এর পরেই ইউরোপের আর কোনো ভূমি নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সপ্তদশ শতকের দিকে এখানে একটি পোর্ট গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে সেই পোর্ট নেই কিন্তু একটি লাইট হাউজ রয়েছে যা সমুদ্রে নাবিকদের লিসবন বন্দরের দিকে জাহাজ পরিচালনায় সহায়তা করে।

চারপাশের প্রাকৃতিক পাহাড়ি সৌন্দর্য ও আটলান্টিক মহাসাগরের গর্জন শুনে তাকে কাছ থেকে আলিঙ্গন করতে মন চাইলো। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচশ ফুট নিচে আটলান্টিক মহাসাগর কিন্তু সরাসরি নামার কোনো ব্যবস্থা নেই। তার উপর একটু পরপর সতর্কতা মূলত সাইনবোর্ডে সাঁটানো রয়েছে যেন কেউ কাঠের সীমানা অতিক্রম না করে।

কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম নিচের সাগরে নামব। মাত্র পাঁচশ ফুট নিছে নামতে পারবো না? একে অপরকে প্রশ্ন করছিলাম। তখন সবাই জানাল সাগরের কাছাকাছি যাবে। আমি তিন বছর আগে আরেকবার এসেছিলাম তখনও আমি নিচে নেমে মহাসাগরের নীল জলরাশি ছুঁয়েছি এবং তার গর্জন শুনেছিলাম। নামার সময় একটি পর্যায়ে দড়ি বেয়ে কিছু অংশ নামতে হয় যা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

portugalকিন্তু আমাদের সদস্য সবাই ছিল সিংহ পুরুষ, তাই অজানা ভয়ংকর সুন্দর পথে পা বাড়াতে একটুও চিন্তা করেনি। মোটামুটি এক তৃতীয় অংশ নামার পরে আবিষ্কার করলাম আমাদের খাবার পানি শেষ। তখন মঈন ভাই ফিরে গিয়ে পানি আনতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমি বাঁধা দিই কারণ এর আগের বারে আমি একটি ঝর্না বইতে দেখেছিলাম সেখানে। চিন্তা করলাম পাহাড় থেকে যেহেতু পানি নামছে তাই সম্ভবত পরিষ্কার পানি হবে।

কিন্তু নামার পরে ঝর্নার পানি হাতে নিয়ে দেখি তা খুবই অপরিষ্কার এবং খাওয়ার অযোগ্য। সবাই আমাকে খানিকটা গাল মন্দ সেরে নিল এবং মুখে ক্লান্তির ছাপও পরিষ্কার ছিল। কিন্তু যেই না সাগরের কাছাকাছি গেলাম এবং বিশাল বিশাল ঢেউয়ের আঁচড়ে পড়া দেখছে পাথরের উপরে, সবার মন ফুর ফুরা হয়ে গেল। সবার মধ্যে আবার নতুন শক্তির সঞ্চার হতে লাগল।

আটলান্টিকের স্বচ্ছ নীল জলরাশি পাথরের উপর একের পর এক আঁছড়ে পড়া দেখে, খানিকটা সময় সবাই হারিয়ে গিয়েছিল নিজের মতো করে। মজার বিষয় হলো এখান থেকে অফিসিয়ালি একটি সার্টিফিকেট নেওয়া যায় আট ইউরোর বিনিময়ে অথ্যাৎ আপনি পৃথিবীর একপ্রান্তের শেষ ভূমিতে পদার্পণ করেছেন তার প্রমাণস্বরূপ এটি অফিসিয়ালি সংগ্রহে রাখতে পারেন।

একদিনের জন্য বন্ধু বান্ধব ও পরিবার পরিজনসহ ঘোরাঘুরি করতে খুবই সুন্দর ও মনোরম একটি জায়গা। স্থানীয় এবং বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীদের পদচারণায় প্রায় সারা বছর মুখরিত থাকে এই স্থানটি।

লেখক- মো. রাসেল আহম্মেদ