cosmetics-ad

বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরার অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনা

biman-crash
প্রতীকী ছবি

আকাশে পাখির মতো উড়ে চলা আকাশযানকে বলা হয় বিমান। মানুষ পরিবহনের যত যান রয়েছে তার মধ্যে এই বিমান দুর্ঘটনা সবচেয়ে মারাত্মক। বিমানে ইঞ্জিনের ক্রুটি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ অজানা বহু কারণেই মাটিতে আছড়ে পড়েছে বিমান। প্রতিটি বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রীদের মৃত্যুর হার জানান দেয় আকাশযানের দুর্ঘটনা কেন এত আতঙ্কের। তাই বলে প্রকৃতির অলৌকিক খেলার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ঘটনা একেবারে কম নয়।

আকাশযানের যত দুর্ঘটনা হয়েছে তাতে যোগ হয়েছে এমন সৌভাগ্যবান মানুষের নাম যারা ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনার পরও প্রাণে বেচে ফিরেছেন। মানুষ চমকে উঠেছে সেসব ঘটনার বর্ণনার পড়ে। এ যেন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেচে ফেরা মানুষের তালিকায় নাম লিখিয়েছে তারা। সত্যি বলতে ঠিক তাই। ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনার পর অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা মানুষের মুখে বর্ণিত সে ঘটনাগুলো শিহরণ জাগায়। তেমন কিছু মানুষের গল্প নিয়েই আজকের আয়োজন-

1বাহিয়া বাকারি: মিরাকল গার্ল বা অলৌকিক মেয়ে বলে খ্যাতি তার বিশ্বজোড়া। নাম তার বাহিয়া। বিমানে করে ভারত মহাসমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিল। ইয়েমেনিয়া ফ্লাইট ৬২৬-এর রুট ছিল সানা, ইয়েমেন থেকে মরনি, কামরুস। এই রুটে অনেক যাত্রী পরিসেবা প্রদানকারী বিমানের চলাচল। অন্যদিনের মতোই আকাশে পাখা মেলেছিল ইয়েমেনিয়া ফ্লাইট। ২০০৯ সালের ঘটনা। এয়ারবাস এ৩১০ উড়ে চলল ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে। কিছুক্ষণ পর ঝাঁকুনি শুরু হলে যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। ভুলটা হয়েছে কন্ট্রোল প্যানেল থেকেই। ভুল কন্ট্রোলিংয়ের কারণেই। বিমানের ক্রুরা কন্ট্রোল প্যানেলে বার্তা বুঝতেও ভুল করেছিল। এসব কারণে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটির দিকে নেমে আসতে শুরু করে। ঝাঁকুনি বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে বিপদের আতঙ্ক রূপ নেয় মৃত্যুর শঙ্কায়। বিমানটি ঠিকই সমুদ্রে আছড়ে পড়ে। বিস্ফোরণ ঘটায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে বিমানটি। যাত্রীদের প্রায় সবাই প্রাণ হারালেও বেঁচে যান বাহিয়া বাকারি। এই শিশুটি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায়। তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। সমুদ্রে লাইফ জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।

2আর্নেস্ট ব্রাডলি: ডগলাস ডিসি-৩ মডেলে একটি বিমান উড়ে যাচ্ছিল চার্লসটিসভিলে-অ্যালবেমার্লে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। ১৯৫০ সালের ৩০ অক্টোবর মাসের ঘটনা। মাঝ আকাশে তখন বিমানটি। হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারায় বিমানটি। প্রথমে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করা হলেও পরে জানা যায় যান্ত্রিক ত্র“টির কথা। বিমানটি সোজা নেমে আসে মাটির দিকে। আছড়ে পড়ে বিকট শব্দে। ২৪ জন যাত্রী ও তিনজন ক্রুর মধ্যে মাত্র দুজন প্রাণে বেচে ফিরে। এর মধ্যে একজনের অবস্থা ছিল ভয়ানক। তবে বেচে যায় আর্নেস্ট ব্রাডলি। মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলেও চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি সেরে উঠতে শুরু করেন। তিনি সুস্থ হওয়ার পর সবাই জানতে পারে রোমহর্ষক সে বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা। কীভাবে অন্য যাত্রীরা তার চোখের সামনে হারিয়ে গেল তা কোনোভাবেই ভুলতে পারেন না তিনি।

3অস্টিন হচ: দুটি বিমান দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া মানুষের তালিকায় যার নাম আসবে তিনি অস্টিন হচ। পৃথিবীতে খুব কম মানুষই আছে যারা এ ধরনের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার পরও প্রাণে বেচেছে। অস্টিন হচ ২০০৩ সালে প্রথমবার এক মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনার পরও প্রাণে বেচে যায়। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া সে ঘটনার বর্ণনা শুনলে সাহসী মানুষেরও বুক কেঁপে উঠবে। তখন সে একেবারে কিশোর বয়সী ছিল। একটি প্রাইভেট প্লেনে চড়ে বসেছিল সে। বিমানটি হঠাৎই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচের দিকে নাক রেখে নেমে আসতে শুরু করে। মাটিতে পড়েই বিস্ফোরিত হয়ে যায়। অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় অস্টিন ও তার বাবা। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি। এরপর ২০১১ সালে একই রুটে আবারও বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছিল অস্টিন। সেবার তার সঙ্গী হয়েছিল বাবা ও সৎ মা। আগেরবার মা ও আত্মীয় মারা গিয়েছিল, এবার তাকে হারাতে হলো বাবা ও সৎমাকে। বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার পর মারাত্মক আঘাত নিয়ে কোনোক্রমে সরে আসে অস্টিন। সে সরে আসার পর জ্ঞান হারায়। উদ্ধারকর্মীরা তাকে ভয়ানক জখমসহ দ্রুত হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে এক বছর ধরে চলে তার চিকিৎসা।

4সিসিলিয়া সিসান: সিসিলিয়া সিসান। বয়স তখন মাত্র ৪ বছর। ১৯৮৭ সালের ঘটনা। নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইনের ফ্লাইট ২৫৫ আকাশে উড়েছিল। ডেড্রয়েট থেকে ফোনিক্সের পথ ধরে উড়ে চলল বিমানটি। বিমানের মডেল ম্যাকডোনাল্ড ডগলাস এমডি৮২। এই বিমানটি মূলত যাত্রীবাহী। ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার যাত্রী নিয়ে নিরাপদেই উড়ান দিয়েছিল। তবে এবারের ঘটনা ব্যতিক্রম। বিমানের টেকঅফ থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। ন্যাশনাল সেফটি রীতিগুলো না মেনেই আকাশে উঠতে শুরু করে বিমানটি। এর সঙ্গে যোগ হয় বিমানের ফ্ল্যাপ এবং স্ল্যাটস ঠিকমতো কাজ করছিল। যান্ত্রিক ত্র“টির সঙ্গে যোগ হয় ভুল উড়ান। সব মিলিয়ে টালমাটাল হয়ে পড়ে বিমানটি। আকাশে কোনোভাবেই থিতু হতে পারছিল না। যাত্রীরা সবাই কোলাহল করতে শুরু করে এরই মধ্যে। কিন্তু যখন সবাই টের পেল বিমানটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন অবশ্যম্ভাবি মৃত্যু আতঙ্ক ছেয়ে যায় বিমানে। এই দৃশ্যগুলো নিজের চোখেই দেখছিল সিসিলিয়া। ১৫৪ জন যাত্রী নিয়ে উড়ে চলা বিমানটি মাটিতে পড়েই বিস্ফোরিত হয়ে যায়। এতগুলো মৃত্যুর মধ্যে একাই বেঁচে ফিরে ৪ বছরের সিসিলিয়া।

5ভেসনা ভালভিক: ভেসনা ভালভিক হলেন সার্বিয়ান নাগরিক। পৃথিবীর ইতিহাসে বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা অলৌকিক মানুষদের কাতারে তার নাম উল্লেখ হয়ে আসছে অনন্য মাত্রায়। পেশায় রাজনৈতিক কর্মী, প্রাক্তন বিমানবালা ছিলেন তিনি। গিনেস বুকে তার লেখা হয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে পতনের পরও জীবিত থাকা মানুষ হিসেবে। ভেসনা ভালভিক ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে বাতাসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তবুও তিনি প্রাণে বেঁচেছিলেন। এই অলৌকিক ঘটনা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই। তিনি প্যারাসুট ছাড়াই মাটিতে নেমে এসেছিলেন। মাটি পড়ামাত্র তার শরীর দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মেরুদণ্ড  ভেঙে যায়। টুকরো টুকরো হয়ে যায় হাড়। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাণে বেঁচে যান। বিমান দুর্ঘটনার ঘটনাটি ঘটে ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি। জিএটি ফ্লাইট নং ৩৬৭। বিমানের একটি কম্পার্টমেন্টে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তাতেই বিমানটি মাটিতে ছুটে আসতে শুরু করে। মাটিতে পড়ার পরই টুকরো টুকরো হয়ে যায় বিমানটি। প্রাণে বেঁচে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু ৩৩ হাজার ফুট উঁচুতে যখন বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারায়, বিস্ফোরণের পরই ঝাঁপ দিয়েছিলেন ভেসনা এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।

6জুলিয়ান ডিলার: জুলিয়ান ডিলারের বয়স তখন ১৭ বছর। ১৯৭১ সালের ঘটনা। তার বাবা মা ছিলেন পরিবেশ বিজ্ঞানী। জুলিয়ান ডিলার যাচ্ছিলেন মায়ের সঙ্গে লেনসা ফ্লাইট ৫০৮ এ করে। এই বিমানটি মূলত যাত্রীবাহী। খারাপ আবহাওয়ার কারণে যান্ত্রিক ত্র“টি দেখা দেয়। যার ফলে টালমাটাল হয়ে পড়ে বিমানটি। আকাশে কোনোভাবেই থিতু হতে পারছিল না। আতঙ্কিত যাত্রীরা সবাই হইহুল্লোড় করতে শুরু করে। দুর্ঘটনায় পড়ার পর বিমানটি যখন ভূপাতিত হয় তখনই আগুন ধরে বিমানের সব যাত্রী মারা গিয়েছিল। কিন্তু একজন ছাড়া। তিনি এই জুলিয়ান ডিলার। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৫৪ সালে। বিমানটি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল তখন অবশ্যম্ভাবি মৃত্যু আতঙ্কের দৃশ্যগুলো নিজের চোখেই দেখছিল জুলিয়ান ডিলার। বিমানটি মাটিতে পড়েই বিস্ফোরিত হয়ে যায়। বেঁচে ফিরে ১১ দিন একা একা আমাজন বনের গহিন অরণ্যে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল তাকে। তার ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে অনেক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজ নির্মাণ করা হয়েছে।

7একা বেঁচে যাওয়া লোকটি: আলজেরিয়ান বিমানটি উড়ে যাচ্ছিল পর্বতমালার ওপর দিয়ে। মিলিটারি এই বিমানটিতে যাত্রী ছিল ৭৮ জন। দুর্ঘটনায় ৭৭ জন মৃত্যুবরণ করলেও আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান একজন। আর তাকে ঘিরেই কৌতূহল সৃষ্টি হয়। আলজেরিয়ার পূর্বপ্রান্তের পর্বতমালার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই বিমানটির নিয়ন্ত্রণ হারান পাইলট। বিমানটির গন্তব্য ছিল পূর্বান্তের সাহারান শহরটিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বজ্রপাতের ঘটনার কারণে বিমানটি আকাশেই প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। এরপর রেডিও ট্রান্সমিশন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বিমানটি। কিন্তু এই বিমানটি পুরোপুরি ধংসপ্রাপ্ত হলেও বেঁচে যাওয়া মানুষটির বর্ণনা শুনে চমকে যেতে হয়। দুর্ঘটনায় পড়া বিমানটির যাত্রীদের শেষ মুহূর্তের দৃশ্য দেখেছেন তিনি। নিজে বেঁচে যান একেবারেই অলৌকিকভাবে। বিমানটি মাটিতে পড়ার পরপরই আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটায়। এই বিস্ফোরণের পর মানুষের বেঁচে থাকার আশা আর ছিলই না। কিন্তু উদ্ধারকারী দল একের পর এক যখন মৃতদেহ সরাচ্ছিলেন তখন দেখতে পান বেঁচে যাওয়া লোকটিকে।

8সাবরিনা হক নাসরিন: ভারতের কর্নাটক রাজ্যের ম্যাঙ্গালোরের বাজপে বিমানবন্দরে ২০১০ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার দুবাই ফেরত একটি ফ্লাইট অবতরণকালে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এতে ১৫৮ জন যাত্রী প্রাণ হারালেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন ৮ জন। এই আটজন সৌভাগ্যবানের একজন ছিলেন বাংলাদেশি তরুণী সাবরিনা হক নাসরিন। সাবরিনার মা-বাবা দুবাইতে বাস করেন। দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এক সময় থেমে যায়। তখন সাবরিনা হক নাসরিন সিটবেল্ট খুলে ফেলেন। চেষ্টা করেন উঠে দাঁড়াতে। তখন মনে হয় পা যেন আটকে গেছে! বিধ্বস্ত এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এই বাংলাদেশি যাত্রী সাবরিন। তিনি বর্ণনা করেন তার সংজ্ঞা হারানোর আগের মুহূর্তটি পর্যন্ত।

বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পূর্ব মুহূর্তের কথা মনে পড়লে এখনো যেন শিউরে ওঠেন তিনি। তিনি বলেন, শেষে গতি না কমিয়েই বিমানটি স্পর্শ করল রানওয়ে। টের পেলাম। গতি তবু কমল না। বরং বাড়ল। আমার মন বলল, কিছু একটা হচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কয়েক মিনিট আগে ঘুম ভেঙেছিল। হয়তো তাই বেঁচে ফিরেছি বাবা-মায়ের দোয়ায়।