cosmetics-ad

জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া : এখনো গলছে না বরফ

japan-korea

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাইরে থেকে বেশ কিছু মিল থেকে গেলেও দুই দেশের সম্পর্ককে কোনো অবস্থাতেই খুব বেশি আন্তরিক বলা যায় না। বরং চাপা এক উত্তেজনা বরাবরই সেই সম্পর্ককে নানাভাবে প্রভাবিত করে গেছে এবং এখনো তা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রায় দুই বছর ধরে সম্পর্ক অনেকটাই যেন মৌন বৈরিতার দিকে এগিয়ে যায়।

জাপান ও উত্তর কোরিয়ার বাইরের মিলের মধ্যে আছে উভয় দেশের মার্কিন সামরিক বলয়ে অবস্থান করা এবং উত্তর কোরিয়া নিয়ে উভয়ের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা বিরাজমান থাকা। দুই দেশেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সহজেই দৃশ্যমান। ফলে কৌশলগত দিক থেকে উভয়ের অবস্থান এতটা কাছাকাছি থেকে গেলেও অতীত ইতিহাসসংক্রান্ত ধারণা এবং সম্পর্কিত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে মতের অমিল এই দুই প্রতিবেশীকে ইদানীং একে অন্যের থেকে আরও অনেক বেশি দূরে ঠেলে দিচ্ছে এবং এর ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঘিরে তৈরি হয়েছে শীতল এক আবহ।
বিজ্ঞাপন

টোকিও ও সিউলের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের শুরু বছর দুয়েক আগে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালতের দেওয়া কয়েকটি রায়ের ফলে। বিশেষ করে দুটি মামলা নিয়ে জাপান খুবই বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন। ১৯১০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের আগপর্যন্ত অবিভক্ত কোরীয় উপদ্বীপ ছিল জাপানের উপনিবেশ। ঔপনিবেশিক শাসন বহাল থাকার সময় কোরিয়ার জনগণকে নানাভাবে নিগৃহীত করার অভিযোগ কোরীয় উপদ্বীপজুড়ে জাপানের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হতে শোনা যায়।

কোরীয় তরুণী ও বালিকাদের জাপানি সৈনিকদের সেবা দেওয়ার জন্য যৌনদাসী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করার অভিযোগটি নতুন নয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কোন্নয়নের পথে অনেক দিন থেকেই বিষয়টি বাধা হয়ে বিরাজমান। কোরীয়দের অভিযোগ, অতীতের সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের জন্য জাপান কখনো ক্ষমা চায়নি এবং এবং বাধ্যতামূলক যৌনসেবা প্রদান করতে গিয়ে যেসব নারীকে জীবনভর ভুগতে হয়েছে, তাদের জন্য কোনোরকম ক্ষতিপূরণ জাপান দেয়নি।
বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে জাপানের দাবি হচ্ছে, বলপূর্বক কাউকে যৌনসেবা প্রদানে নিয়োগ করা হয়নি এবং যৌনদাসী হিসেবে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা তা স্বেচ্ছায় এবং স্বপ্রণোদিত হয়েই করেছেন। ফলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখানে অপ্রাসঙ্গিক বলে জাপান মনে করে। জাপানের এ রকম ঢালাওভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে যাওয়ার কারণেই টোকিওর ওপর পরোক্ষ চাপ প্রয়োগের একটি পথ হিসেবে বেঁচে থাকা ভুক্তভোগীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে মাঝেমধ্যে আদালতের শরণাপন্ন হতে দেখা যায়।

এ রকম এক বিচারে বছর দুয়েক আগে সিউল জেলা আদালতের দেওয়া রায়ে ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জাপানের প্রতি জানানো হয়েছিল। জাপান সেটাকে এ কারণে সহজভাবে নিতে পারেনি যে টোকিও বলছে ১৯৬৫ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় অমীমাংসিত সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এবং নতুন করে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া ২০১৫ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তিকেও জাপান বিশেষ সেই সমস্যা সমাধানের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে, যে চুক্তিতে সমস্যার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া দুই পক্ষ মেনে নিয়েছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বক্তব্য হচ্ছে, দেশের জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে তৎকালীন সরকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগে চুক্তিটি স্বাক্ষর করায় এর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ।

যুদ্ধকালীন যৌনসেবা প্রদান সমস্যা ছাড়াও কোরীয়দের বাধ্যতামূলক শ্রম প্রদানে নিয়োগ করার অভিযোগও জাপানের বিরুদ্ধে কোরীয় উপদ্বীপজুড়ে উত্থাপিত হতে শোনা যায়। এই প্রশ্নেও জেলা আদালত জাপানের কয়েকটি কোম্পানিকে ভুক্তভোগী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং নির্দেশ মানা না হলে এদের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ জারি করে। উচ্চ আদালত অবশ্য পরে সেই রায় পাল্টে দিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টিও জাপানের নেতাদের ক্ষুব্ধ করেছে, এতটাই যে দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকেই কেবল তাঁরা বিরত থাকছেন না, এমনকি আন্তর্জাতিক সমাবেশে দেখা হয়ে গেলেও কেবল শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে যোগাযোগ তাঁরা সীমিত রাখছেন।

দুই দেশের নেতাদের মধ্যে মুখোমুখি সাক্ষাৎ ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে আছে। এমনকি টোকিও অলিম্পিক এগিয়ে আসতে থাকা অবস্থাতেও বরফ গলার লক্ষণ তেমন দেখা যাচ্ছে না। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম এর জন্য মূলত জাপানকে দায়ী করে কিছুদিন আগে ব্রিটেনে শেষ হওয়া জি-৭ শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগার আচরণের দিকে নির্দেশ করছে। বহুপক্ষীয় এ রকম শীর্ষ সম্মেলনের একটি প্রধান দিক হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের নেতাদের সেখানে অন্তত পক্ষে শুভেচ্ছা সাক্ষাতে হলেও মূল বৈঠকের বাইরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হওয়ার সুযোগ পাওয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জি-৭ সম্মেলন চলাকালে প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনের সঙ্গে সুগার ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী এতে শীতল সাড়া দেন।

দক্ষিণ কোরিয়া জি-৭–এর সদস্য না হলেও স্বাগতিক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের আমন্ত্রণে মুন শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলন চলাকালে তিনবার সুগা ও মুনের সাক্ষাৎ ঘটে। উভয় দেশের সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মুন বৈঠক আয়োজন নিয়ে সুগার সম্মতি পাওয়ার চেষ্টা করলেও সুগা বলেছেন যে কর্মকর্তা পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কোনোরকম সমন্বয় না ঘটায় আলোচনায় তিনি জড়িত হতে পারছেন না। সুগা অবশ্য উদ্যোগ গ্রহণের জন্য মুনকে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মানদণ্ডে সেটা যথেষ্ট ছিল না।

এদিকে জাপান এখন চাইছে টোকিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে মুন যেন যোগ দেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে থেকে বলা হয়েছে যে কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখার জন্য জাপান ভ্রমণে গিয়ে সময় নষ্ট করার সুযোগ মুনের সামনে নেই এবং জাপানের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাব পাওয়া গেলেই কেবল প্রেসিডেন্ট মুন ২৩ জুলাই টোকিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ভেবে দেখবেন।
বিজ্ঞাপন

এ রকম বিভিন্ন অগ্রগতির আলোকে টোকিও ২০২০–এর আয়োজন এগিয়ে আসা অবস্থায় প্রতিবেশী একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে নিতে কোনো পদক্ষেপ জাপান গ্রহণ করে, সেদিকে এখন অনেকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হচ্ছে। খেলাধুলা যে কখনো কখনো কূটনীতির মোক্ষম চাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, সে রকম দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। চীনের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় পিং পিং ডিপ্লোমেসির ভূমিকা সম্পর্কে অনেকেই অবগত। ফলে টোকিও-সিউল সম্পর্কের বেলায় টোকিও অলিম্পিক বরফ গলার প্রক্রিয়া শুরু করে দিতে পারবে কি না, সেদিকে এখন নজর রাখছেন বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি উভয় দেশের সংবাদমাধ্যম।

লেখক- মনজুরুল হক, টোকিও, জাপান
সৌজন্যে- প্রথম আলো