sentbe-top

রোজার স্মৃতি ও কোরিয়ায় আমার প্রথম ইফতার

বিদেশী শিক্ষার্থীদের সাথে লেখক

রমজান মাস আমাদের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ মাস। ছোটবেলা যখন কিছু বুঝতাম না তখন দিনে তিনটা রোজা রাখতাম। কোনো কোনো দিন পাঁচটা রোজা রাখার ও ইতিহাস গড়েছি! ইফতারের সময় আব্বার জন্য অপেক্ষা করতাম কখন বাজার থেকে ইফতার নিয়ে আসবেন। গ্ৰামের ইফতারে ছোলা,  মুড়ি বুন্দিয়া ছিল খুব সাধারণ বিষয়। এইগুলো ছাড়া ইফতার জমে উঠতো না।

যখন একটু বড় হলাম তখন বুঝতে শিখেছি যে দিনে একটাই রোজা রাখতে হয়! কিন্তু মুশকিল হলো বাবা মায়ের বড় ছেলে হওয়ায় তারা ভাবতো যে ছেলে আমার রোজা রাখলে শুকিয়ে যাবে তাই রোজা রাখতে নিষেধ করতো। হয়তো সকল বাবা মা এমন ভাবে ভাবেন।  অনেক সময় আমরা ভাইবোনরা বাজি ধরতাম কে কয়টা রাখতে পারে। আমার বোন একটা রোজা রাখতে গিয়ে চোখ ঘোলা করে মাথা টলমল করে পরে থাকতো। তাই খুব সহজেই আমি জিতে যেতাম।

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একদিন বড় হলাম। নিজের বাড়ি, বাবা মা, ভাইবোন সবাইকে ছেড়ে পাড়ি জমালাম ভাগ্যের সন্ধানে পড়াশোনার জন্য ঢাকা শহরে। যে মেসে থাকতাম সবাই খুব আন্তরিক আর ভালো মানুষ হওয়ায় অল্পদিনেই নিজেকে মানিয়ে নিলাম। এখানে সবাই উৎসব মুখর পরিবেশে রোজা রাখতাম। মেসেই তৈরী হতো সকল ইফতার আইটেম। এইভাবে নয় দশজন একসাথে ইফতারের আনন্দে ভুলেই যেতাম সারাদিন রোজা রাখার কষ্ট। তখন ইফতারের এই আকষর্ণীয় আয়োজনের জন্য সকল রোজা রাখতাম। তখন অবশ্য ভিডিও কলের সুবিধা না থাকায় বাবা মা বুঝতে পারতো না যে তাদের ছেলে রোজা রেখে দেখতে কেমন হয়েছে। তবু যখন বলতাম যে মা আমি সকল রোজা রেখেছি তখন হয়তো ছেলের শুকিয়ে যাওয়া চেহারাটা তার চোখে ভেসে উঠতো।  হয়তোবা আড়ালে চোখের জল ফেলতো! তবে মা আমাকে তখন নিষেধ করতোনা কিন্তু বাবা বলতো ‘তুই বড় হয়ে নে, তারপর রোজা রাখিস’।

যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলাম তখনকার চিত্রই অন্য রকম। আনন্দটা যেনো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রতিদিন কোনো না কোনো ইফতার পাটি লেগেই থাকতো। ইফতার পার্টিতে আয়োজনের ধরণ ও পাল্টে গেল। রকমারী আয়োজনে অনেকে একসাথে ইফতার করতাম। বরিশালে চাকুরীর সুবাদে প্রথম যাই। আমরা তিনজন একসাথে থাকতাম তবে আমাদের কেউ একজন বিদেশ যেতো আর সেই জায়গায় আরেকজন উঠতো। ঘরোয়া ভাবে ইফতার হতো। তবে সেই ছোটবেলার বুন্দিয়া আর জিলাপির ভালোবাসা আমি ছাড়তে পারিনি। বরং সময়ের সাথে সেটা বেড়েছে। আমি আমার পছন্দের এইসব বাজার থেকে নিয়ে আসতাম, খুব মজা করে খেতাম। সেই সময়ের স্মৃতির মধ্যে আলিম ভাই এইটা নিয়ে প্রায় অনেক মজা করতেন। মাহবুব, আহমেদ উল্লাহ এর সেই ঐতিহাসিক শরবত, আলিম ভাইয়ের ভীতু ভীতু হাতে মরিচ পেঁয়াজ মাখানো আরও কতোই না রঙিন ইতিহাস। আমরা অবশ্য রমজান মাসে বাসায় একদিন ইফতার পার্টি করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন‍্যান‍্য কাছের সবাইকে নিয়ে একসাথে ইফতার করতাম। হাশিখুশি আড্ডায় সময় পার করেছি।

আজ আমি উচ্চ শিক্ষা নিতে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এখানেও সৌভাগ্যক্রমে রমজান মাস পেয়েছি। আজকেই প্রবাসে আমার প্রথম রমজান এবং প্রথম ইফতার। আজ যখন একা ইফতারে বসেছি তখন পিছনের সকল ইতিহাস যেনো চোখের সামনে ভেসে আসছে। কি দিয়ে ইফতার করলাম সেটা না হয় আর নাই বলি। এক বড় ভাই ছবি দিয়েছে শসা আর টমেটো দিয়ে ইফতার করছে। হয়তোবা এটাই এখানকার আনন্দ! যাদের সাথেই কখনো ইফতার করার সুযোগ হয়েছে সকলকেই খুব শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন এই দোয়া করি।

জামাল উদ্দিন, এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে উচ্চশিক্ষা নিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় অধ্যয়নরত)।

sentbe-top