sentbe-top

নির্বাচনে যেতে বিএনপির ছয় শর্ত, বৃহত্তর ঐক্যের ডাক

bnpএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দেওয়া, সরকারের পদত্যাগসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে আরো বৃহত্তর ঐক্য গড়ার জন্য সব দল ও সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আয়োজিত এক জনসভায় এসব শর্তের কথা জানান বিএনপির নেতারা।

জনসভায় সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের শেষ কথা- অবিলম্বে খালেদা জিয়াসহ সকল কারাবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। জাতীয় সংসদকে ভেঙে দিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের সময়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। সামরিক বাহিনীকে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।’

গণতন্ত্র রক্ষায় সকলকে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন, এখন আর বিভেদ নয়, কালবিলম্ব নয়; গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য, বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য, দেশের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশনেত্রী কারাগারে যাওয়ার আগে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে বলেছেন। সেই জাতীয় ঐক্য হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

‘যারা আজকে ঐক্য করছেন, তাদের আমরা আহ্বান জানাই- আসুন, আরো বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে এই দুঃশাসনকে, স্বৈরাচারকে, যারা বুকের ওপর বসে আছে, তাদের পরাজিত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করি,’ বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তিনি নির্জন কারাগারে পরিত্যক্ত ভবনে কারাবাস করছেন। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে গণতন্ত্র ও বিএনপিকে ধ্বংস কারার জন্য তাকে আজকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। সাধারণ বন্দি যে সুবিধা পায় তিনি সেটিও পাচ্ছেন না। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। বারবার বলা সত্বেও এই অবৈধ সরকার তা শোনেনি।’

‘জনগণের কাছে ফরিয়াদ জানাতে চাই, যিনি গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, সেই গণতন্ত্রের জন্য আজ খালেদা জিয়া কারাগারে রয়েছেন। স্বামী হারিয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন, এক পুত্র নির্বাসিত। সেই জাতির কাছে তার এই কি প্রাপ্য? বুকে সাহস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। গণতন্ত্রের মাতা খালেদা জিয়াকে আর কারাগারে দেখতে চাই না’, বলেন তিনি।

অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অন্যথায় এর দায় আপনাদের নিতে হবে।’

বিএনপির ভয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের রাতে ঘুম হয় না, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তারা সবসময় দুঃস্বপ্ন দেখেন। এই আসলো আসলো, বিএনপি আসলো, তারেক রহমান আসলো, খালেদা জিয়া আসলো। এই ভয়ে রাতে তাদের ঘুম হয় না। ২৪টা ঘণ্টা শুধু বিএনপিভীতি, খালেদা জিয়াভীতি, তারেক রহমানভীতি।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এই ভীতি থেকে বাঁচার জন্য কতো রকমের কারসাজি। এখন নিয়ে আসছে ইভিএম। যদি ইভিএম মেশিন তাদের রক্ষা করতে পারে! কারণ, মানুষ তাদের রক্ষা করবে না। এই দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে গেছে। এখন একটি দেউলিয়া রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আগে সরকার খুব বড়াই করে বলত, তরুণ-যুবকরা নাকি তাদের সঙ্গে আছে। এখন এই তরুণ-যুবকরা প্রতি মুহূর্তে চায় এই পাথর, এই দুঃশাসন কবে যাবে। কোমলমতি শিশুদের হেলমেট পড়ে নির্যাতন করছিল, তাদের মা-বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে, এমনকি যাদের মা-বাবা খাবার দিতে গেছে তাদের পর্যন্ত কারাগারে নিয়ে নির্যাতন করেছে।’

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির মহাসবি বলেন, ‘তাকে মারতে মারতে নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেয়নি। সারা বিশ্ব বলছে, ছেড়ে দাও। তারা মুক্তি দিচ্ছে না। কারণ, তার অপরাধ তিনি আল জাজিরায় বলেছিলেন, এই সরকার অবৈধ। এরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। জোর করে ক্ষমতায় আছে।’

bnpবিএনপির জনসভায় লোক ব্যাপক সমাগম দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকের জনসভা প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ আবার জেগে উঠেছে। একাত্তরে যেভাবে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, ৯০তে যেভাবে বুকের রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল, আজকে আবার বুকের রক্ত দিয়ে হলেও দেশমাতাকে ফিরিয়ে আনবে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনবে।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই ১০ বছরে আমাদের অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। বহু নেতাকর্মী গুম হয়ে গেছেন। তাদের কোনো খোঁজ আমরা পাচ্ছি না। তাদের সন্তানরা বলে, বাবার সঙ্গে ঈদ করতে চাই। তাদের বাবা-মা বলে, আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও। বোনরা বলে, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও। যারা গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন, তাদের রক্ত ছুয়ে শপথ নিতে হবে, আমরা বাংলাদেশকে মুক্ত করবই। গণতন্ত্রকে মুক্ত করবই। এই দুঃশাসনকে আমরা পরাজিত করবই।’

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সরকার নতুন করে ষড়যন্ত্র করছে, অভিযোগ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘মন্ত্রী আগেই বলে দিচ্ছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তারেক রহমানের সাজা হবে। আপনারা কি বিচারকের দায়িত্ব নিয়েছেন? তদন্ত করেছেন ঠিকমতো? আপনারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই তদন্তকে প্রভাবিত করেছেন।’

‘পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই ধরনের ষড়যন্ত্রের রায় বাংলাদেশের মানুষ কখনো মেনে নেবে না। আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। গণতন্ত্রকে মুক্তি দিতে হবে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থাযী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপির এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। তার মুক্তির সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সরকার রক্তচক্ষু দেখিয়ে খারাপ কাজ করতে বাধ্য করছে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে অতীতের কথা ভুলে গিয়ে ভালো হয়ে যান। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তারাদের উদ্দেশে বলছি, যারা ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা লুট করেছে, সোনা চুরি করেছে, কয়লা চুরি করেছে তাদেরকে চিহ্নিত করুন। তারা যেন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে না যেতে পারে।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা খালেদা জিয়াকে আইনিভাবে মুক্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি। যখনই মুক্তির দ্বারপ্রান্তে আসি, তখনই সরকার অন্য মামলায় আটক দেখিয়ে জামিন বিলম্বিত করছে। তাই তাকে মুক্তির একমাত্র পথ রাজপথ।’

জনসভাকে কেন্দ্র করে দুপরের আগেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। রাজধানী ছাড়াও গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ থেকেও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীরা জনসভায় যোগ দেন।

sentbe-adহাজারও নেতাকর্মীর পদচারণায় ফকিরাপুল মোড় থেকে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই ধার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তাদের হাতে দেখা যায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি সংবলিত ফেস্টুন ও ব্যানার। ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে সমাবেশস্থল মুখরিত করে তোলেন নেতাকর্মীরা। বেলা ২টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর বানানো অস্থায়ী মঞ্চ থেকে পবিত্র কোরআন তেলোয়াতের মাধ্যমে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়।

সমাবেশে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল আলম চৌধুরী, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জয়নুল আবদিন, বেগম সেলিমা রহমান, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, আব্দুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, তৈয়মুর আলম খন্দকার, ফরহাদ হালীম ডোনার, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি সামসুল আলম তোফা প্রমুখ।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল খান, সহ-যুববিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সহ-সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিম উদ্দীন আলম, আবু নাসের মোহাম্মাদ রহমাতুল্লাহ, কামরুল ইসলাম সজল, মো. মতিন, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দীন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, সহ-সভাপতি নবী উল্লাহ নবী, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরীন খান, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোর্তাজুল করিম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, সহ-সভাপতি গোলাম সরোয়ার, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর, দক্ষিণের সভাপতি রফিকুল আলম মজনু প্রমুখ।

সৌজন্যে- রাইজিংবিডি

sentbe-top