সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই ॥ আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাগরিক শ্রদ্ধা

samsulসমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)।মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি রাজধানীর গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী প্রথিতযশা লেখিকা ও ডাক্তার সৈয়দা আনোয়ারা হক এবং এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।তার মৃত্যুতে সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গণে শোকের ছায়া নেমে আসে। উভয় অঙ্গণের গুণীজনেরা তাঁকে একনজর দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে যান।

কবি ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্যান্সার কেয়ার সেন্টারের কনসালট্যান্ট ডা. অসীম কুমার সেনগুপ্তের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল।বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তার ব্লাড প্রেসার খুব ‘লো’ হয়ে যাওয়ায় তা স্ট্যাবল করার চেষ্টা করেন। হাঁড় ও যকৃতসহ লেখকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল।

ক্যান্সারে আক্রান্ত সৈয়দ হক লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ইউনাইটেড হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরমধ্যেই সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিলো।

চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত লেখক সৈয়দ শামসুল হক উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সস্ত্রীক লন্ডনে গিয়েছিলেন এ বছরের ১৫ এপ্রিল। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যেরও নাগরিক হওয়ায় লন্ডনে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের (এনএইচএস) নিয়মিত চিকিৎসকের (জিপি) মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করান তিনি। এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ম্যাকডোনাল্ডের তত্ত্বাবধানে লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। পরে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ নিউসাম ডেভিসের তত্ত্বাবধানে চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতালে কেমোথেরাপি নেন। কিন্তু টানা প্রায় তিন মাসের চিকিৎসা শেষে মন খারাপ করা খবর নিয়েই দেশে ফিরেছেন তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন মাত্র ছয় মাস বাঁচবেন কবি। মৃত্যুমুখে দাঁড়ানো এই সময়টা কবি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে চেয়েছেন নিজের দেশেই। তাই লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ভর্তি হন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখতে যান তাকে। নেন তার যাবতীয় চিকিৎসার দায়ভার।

কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, চলচ্চিত্র, গান, কাব্য নাট্যসহ সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল সৃষ্টিশীলতায় কবি ‘সব্যসাচী লেখক’ হয়ে ওঠেন। সৈয়দ হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমী পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন।

সৈয়দ হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও মাতা হালিমা খাতুন। তিনি পিতা-মাতার ৮ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।

কবির ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর রচিত প্রথম পদ ‘আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/ তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে’। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী অবস্থায় এগারো-বারো বছর বয়সে তিনি এ পদ’টি লিখেছিলেন।

সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুল থেকে। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। এরপর ১৯৫০ সালে গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে তিনি ব্যক্তিগত খাতায় ২০০টির মতো কবিতা রচনা করেন। তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের মে মাসে। ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায়। সেখানে ‘উদয়াস্ত’ নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়।

সৈয়দ হকের পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে তিনি ডাক্তারি পড়াবেন। কিন্তু পিতার এ রকম দাবি এড়াতে তিনি ১৯৫১ সালে বোম্বে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেকের বেশি এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হন। কলেজ পাসের পর ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সালে সেখান থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেড়িয়ে আসেন। এর কিছুদিন পর তার প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ প্রকাশিত হয়।

তিনি একুশে পদক (১৯৮৪), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৬) ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯), অলক্ত স্বর্ণপদক (১৯৮২), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৮৩), লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক (১৯৮৩), জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক (১৯৮৫), পদাবলী কবিতা পুরস্কার (১৯৮৭), নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯০), টেনাশিনাস পদক (১৯৯০) ও মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার ২০১১ উল্লেখযোগ্য।

তাঁর লেখা উপন্যাস নিষিদ্ধ লোবান অবলম্বনে চলচ্চিত্রকার নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’ নির্মাণ করেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে আগামীকাল সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কবির মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে রাখা হবে।বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।পরে কবির মরদেহ হেলিকপ্টারে করে তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তাকে দাফন করা হবে।