sentbe-top

প্রবাসের চিঠি: শাস্তির অপর নাম জরিমানা

uk-streetঅনেকের কাছে শুনেছি, বিলেতে রাস্তায় থুথু, টিস্যু ও সিগারেট ফেললে নাকি জরিমানা দিতে হয়। এমনকি সঠিক জায়গায় যদি গাড়ি পার্ক না করে, তাহলেও নাকি জরিমানার সম্মুখীন হতে হয়।

কথাগুলো শোনার পর খুব অবাক হয়েছিলাম! কারণ আমাদের দেশে তো এই ধরনের কোনো নিয়ম নেই। তাছাড়া এই ধরনের নিয়মের সাথে আমরা খুব একটা পরিচিতও নই। তবে এই দেশে আসার পর যখন আমার সামনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটলো, তখন অবশেষে বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম।

প্রশংসা না করে পারছি না। এইখানে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বা জিনিসে নিয়ম-কানুন রয়েছে এবং সেই নিয়মগুলো যদি ভেঙ্গে ফেলা হয়, তাহলে তার শাস্তি হিসেবে জরিমানা নির্ধারণ করা হয়। সুতরাং জরিমানা যে ভয়ংকর একটা শব্দ, সেটা আর বুঝতে বাকি রইলো না।

এক কথায় জরিমানা হচ্ছে নিয়ম-কানুন মেনে না চলার শাস্তি। যার কারণে প্রতিনিয়ত সবাইকে সর্তক থাকতে হয় এই জরিমানা বা শাস্তি থেকে দূরে থাকার জন্য। তবে এক দিক দিয়ে ভালো, হয়তো এই জরিমানার কারণেই মানুষ এখনো ঠিকমতো নিয়ম-কানুন মেনে চলছে।

এই দেশে আসার পর প্রথম দিকে আমার মাথায় সব সময় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতো, সেটি হলো- এতো মানুষ বসবাস করে এইখানে কিন্তু তারপরও কীভাবে সবকিছু নিয়মানুযায়ী চলছে? তবে এই প্রশ্নের উত্তরটিও পেতে খুব বেশি দিন সময় লাগেনি।

পরিবেশের কারণে মানুষের যে পরিবর্তন হয়, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আমি নিজেই। যখন বাংলাদেশে থাকতাম, তখন যেখানে-সেখানে টিস্যু বা খাবারের প্যাকেট ফেলতাম। কিন্তু এই দেশে আসার পর পরিবেশের কারণে বাধ্য হয়েছি নিজেকে পরিবর্তন করতে। কেউ কিন্তু আমাকে এসে বলেনি, কখন কোন জিনিসটি কোথায় বিন করা উচিত বা ময়লা ফেলা উচিত।

এক কথায় আমি মুগ্ধ! এইদেশের প্রত্যেকটি নিয়মেই আমি মুগ্ধ। আসার পর থেকে কেন জানি সবকিছুই আমাকে আর্কষণ করছে এবং এখন বুঝতে পারছি এই আর্কষণ করার পেছনে শুধু একটিই কারণ- এই দেশের নিয়ম-কানুন। তবে এতোটুকু বলতে পারবো, আজকে এই ইংরেজ জাতি উন্নত হওয়ার পেছনে তাদের এই নিয়ম-কানুনগুলো।

কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে অবগত হলাম, কেন এই দেশে প্রত্যেকটি কাজ সঠিক নিয়মেই হচ্ছে। সম্প্রতি তিনটি ঘটনা আমাকে খুবই অবাক করেছে।

প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিলো লন্ডনের ক্রয়ডন নামক একটি জায়গায়, যেখানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থিত। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আমার এক বন্ধু সিগারেট খেয়ে সেটি রাস্তায় ফেলে দিয়েছিলো এবং কয়েক সেকেন্ড পরে দুইজন পুলিশ এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো- এই সিগারেটটি কেন ফেললো রাস্তায় বিন বক্স থাকা সত্ত্বেও।

আমার বন্ধুটি ‘সরি’ বলার পরও তার জরিমানাটা কিন্তু মাফ হয়নি বরং সাথে সাথে তাকে ৮০ পাউন্ড জরিমানা দিতে হলো। তাকে সর্তক করে দিলো পরবর্তীতে যাতে এই কাজ না করে। আমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন, কারণ চোখের সামনে এতোগুলো টাকা তাকে জরিমানা দিতে হলো!

সেদিন পুলিশের একটি কথা আমার খুব ভালো লেগেছিলো। পুলিশ বললো, “আমি যদি তোমাকে এখন মাফ করে দেই, তাহলে তুমি আরও করবে। সেটা যাতে না করো, সেজন্য তোমাকে শাস্তি হিসেবে জরিমানা দিতে হবে।” একবার ভাবুন তো, এই রকম নিয়ম বা সার্ভিস যদি আমাদের দেশে থাকতো, তাহলে আজ দেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যেতো। তবে এক দিক দিয়ে ভালোই হলো, ওইদিন আমার বন্ধুর সাথে আমরা যারা ছিলাম, এক কথায় আমাদেরও শিক্ষা হয়ে গেলো।

এবার আসুন দ্বিতীয় ঘটনায়। গত সপ্তাহে ট্রেনে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় এক যাত্রী তার ট্রাভেল কার্ড ইচ্ছে করে টার্চ করেনি বলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে ৮০ পাউন্ড জরিমানা দিতে হলো। তাও আমার সামনে এই ঘটনাটি ঘটেছিলো। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না চোখের সামনে কিভাবে ৮০ পাউন্ড জরিমানা হয়ে গেলো। কারন ৮০ পাউন্ড জরিমানা কিন্তু চারটে কথা না। এখন মনে হচ্ছে এই সমস্ত নিয়মের কারণেই ইংল্যান্ড এখনও টিকে আছে।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটেছিলো একটি শপিং মলের সামনে। ভুল জায়গায় গাড়ি পার্ক করার কারণে জরিমানা দিতে হয়েছিলো আমার এক বান্ধবীকে। শুধু যে শপিং মল বা অফিস-আদালত বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নয়, এমনকি এইখানে প্রত্যেকটি বাসার সামনেও গাড়ি পার্কিং-এর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। হয়তো এই নির্দিষ্ট জায়গার কারণেই রাস্তা বা অলি-গলিতে কোনো ধরনের জ্যাম সৃষ্টি হয় না। কিন্তু দেখুন এমনকি এই ক্ষেত্রেও আমাদের দেশে একেবারে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আমরা কি পারি না, এই ধরনের নিয়মগুলো আমাদের দেশে শুরু করতে?

শেষ ঘটনাটি কিন্তু খুব মজার। আমরা আগে যে বাসায় থাকতাম, সেই বাসায় বক্স অনুযায়ী ময়লা-আর্বজনা ঠিক মতো ফেলা হয়নি বলে বাড়িওয়ালাকে জরিমানা দিতে হয়েছিলো। কি অদ্ভুত নিয়ম, তাই না! শেষ পর্যন্ত ময়লার জন্যও জরিমানা দিতে হয়।

ও, আরেকটি কথা। এই দেশে কিন্তু প্রত্যেকটি বাসায় দুটো রঙ-এর ময়লা ফেলার বক্স বা বিন থাকে, একটি কালো এবং অন্যটি সবুজ রঙ। যেসব ময়লা বা আবর্জনা রি-সাইকেল করা যায় সেগুলো রাখা হয় সবুজ বক্সে এবং কালো বিন বক্স হচ্ছে তার বিপরীত। কিন্তু আর্বজনা বিন করতে যদি ভুল হয়, তাহলে জরিমানা দিতে হবে।

এই বক্সগুলোর কারণেই এইদেশে রাস্তাঘাটে বা পথেঘাটে কোনো আর্বজনা দেখা যায় না। আর আমাদের দেশের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো চিত্র দেখা যায় বরাবরই। এমনকি পরিবেশ দূষিত হওয়ার পেছনেও কিন্তু এই ময়লা-আর্বজনাই দায়ী।

আজকে আমাদের দেশে যদি এই ধরনের নিয়ম-কানুনগুলো থাকতো তাহলে এতোদিনে দেশ অনেক উন্নতি করতে পারতো। কিছু নিয়ম তো আছে বটে, কিন্তু আমরা সেই নিয়মগুলো ঠিকমতো পালন করি না।

মনে রাখতে হবে একটি দেশের উন্নতির জন্য শুধু সরকারকেই সচেতন থাকলে হবে না, বরং সেই সাথে জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে।

লেখক: শাফিনেওয়াজ শিপু, লন্ডন থেকে
ই-মেইল: topu1212@yahoo.com

sentbe-top