cosmetics-ad

অন্য ভাবেও হুমকি মোকাবিলা করা যায়

trump-kim

বহু বছর ধরে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, তারা এই দুই দেশকে গোলাবারুদের বন্যায় ভাসিয়ে দেবে। কারণ, এরা উত্তর কোরিয়ার প্রথাগত ও পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে বাদ সেধেছিল। উত্তর কোরিয়ার নেতারা এমনভাবে চেঁচামেচি করছেন যে মনে হয়, ছোট আকৃতির ইয়াপি কুকুর শান্ত ও সহিষ্ণু রটওয়াইলার প্রজাতির কুকুরকে তাড়া করছে, যে তার পারমাণবিক হার নিয়ে গেছে।

ওদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃশ্যত নিজ দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ভুলে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বুলি ধার করে মহা আড়ম্বরে ‘গুলি ও ক্রোধের’ (ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি) হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এমন আক্রমণ করা হবে, ‘যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে পৃথিবী পারমাণবিক বোমার বিভীষিকা দেখেছে, সে কারণে এসব কথা বিপজ্জনক। উল্লেখ্য, জাপানে যে বোমা ফেলা হয়েছিল, তা উত্তর কোরিয়ার নির্মিত বোমার চেয়ে অনেক ছোট।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা নিশ্চিন্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা উড়িয়ে দিতে পারি না। ১৯৯৯ সালে এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা।’ আর এখন উত্তর কোরিয়া ‘নিউইয়র্ক সিটি ও ওয়াশিংটনের দিকে পারমাণবিক অস্ত্র তাক করার আগেই’ তিনি দেশটিকে নিবৃত্তিমূলক হামলার পরিকল্পনায় হাওয়া দিচ্ছেন। যদিও সামরিক নেতৃত্ব এ ধরনের নিবৃত্তিমূলক সামরিক হামলার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন।

সে কারণে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভাকে জোর দিয়ে বলতে হবে, উত্তর কোরিয়ার প্লুটোনিয়াম ও ইউরেনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক স্থাপনা ও অস্ত্র নিশ্চিহ্ন করে দিতে গেলে কত মানুষের জীবনহানি ঘটবে। এই সংখ্যাটা শুনে আমাদের মাথা দুলে উঠতে পারে। সম্ভবত লাখ লাখ দক্ষিণ কোরীয় ও মার্কিন নাগরিক মারা পড়তে পারেন। আর যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু জানে না উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনা, অস্ত্র, উপাদান ও বিজ্ঞানীদের কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সেহেতু বড় রকমের সামরিক অভিযান সফল না–ও হতে পারে।

এই অবস্থায় একমাত্র সমাধান হচ্ছে বহুমুখী কৌশল প্রণয়ন করা। ২০১১ সালের শেষভাগে কিম জং উন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাঁর তিনটি লক্ষ্য ছিল: ক্ষমতা সংহত করা, আন্তর্জাতিক শক্তি যাতে তাঁর সরকারকে উৎখাত করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা ও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে কিম বংশের দীর্ঘকালীন শাসন নিশ্চিত করা।

এই শেষ ব্যাপারটা প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। তিনি সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। পুরোনো কোরীয় বিশ্লেষকেরা বলেন, কিম বোঝেন, তাঁর পক্ষে বেশি দিন উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়িত রাখা এবং বহির্বিশ্বের সাপেক্ষে তাঁরা কতটা দরিদ্র—সে ব্যাপারে জনগণকে অজ্ঞ রাখা যাবে না। কিন্তু অর্থনীতিকে সংহত করতে তাঁর সময় দরকার।

উত্তর কোরিয়া যে মার্কিন মুলুকে আঘাত হানার মতো ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়েছে বলে প্রদর্শনী দিয়েছে, তার লক্ষ্য হচ্ছে ওয়াশিংটনকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখা। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন, কিম পরিবার যদি বিশ্বাস করে যে যুক্তরাষ্ট্রের আঘাত আসন্ন, তখনই কেবল তারা পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ করবে।

সে কারণে এই অবস্থায় সবচেয়ে ভালো নীতি এ রকম হবে যে তাকে একদিকে যেমন নিরোধক ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি অন্যদিকে চাপ, কূটনীতি, প্রণোদনা—এসবও প্রয়োগ করতে হবে। আবার অতীতের সফলতা ও ব্যর্থতা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা উন্নত করতে হবে। অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া চালাতে হবে। এর সঙ্গে পারমাণবিক সুরক্ষার কথাও ভাবতে হবে। জাতিসংঘ নতুন করে উত্তর কোরিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করায় তার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

কূটনীতির মাধ্যমে উত্তর কোরীয় নাগরিক এবং চীনা ও রুশ সরকারকে বোঝাতে হবে, কিম জং উনকে উৎখাত বা উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করা যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। বরং তার লক্ষ্য হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি মোকাবিলা করা। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে এই প্রস্তাব দিতে পারে যে বাজার সংস্কার ও বেসরকারীকরণের লক্ষ্যে তারা যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা চালিয়ে গেলে তাদের প্রণোদনা দেওয়া হবে।

ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রসঙ্গে বলতে পারি, ক্যাপিটল হিল ও ২০০৮ সালে উত্তর কোরিয়া সফরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ১৯৯৪ সালে যে কাঠামোর মতৈক্য হয়েছিল, তা উত্তর কোরিয়ার প্রতারণার আগ পর্যন্ত কাজ করেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন কূটনীতি, চাপ বা প্রণোদনা দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারেনি। ২০০০-এর শুরুর দিকেও নিষেধাজ্ঞা কাজ করেছে, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি না করেই তা বাতিল করে।

শেষমেশ, জাতিসংঘ আস্থা নির্মাণ করে উত্তর কোরিয়া কথিত ‘মানবিক’ ব্যাপারে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, অর্থাৎ পিয়ংইয়ংয়ে আটক মার্কিন ও জাপানি বন্দীদের মুক্ত করা, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষের পারিবারিক মিলন ও কোরীয় যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষ প্রত্যাহার করা।

ট্রাম্প এখন কৌশলের চারটি মাত্রা একত্রে প্রয়োগ করতে পারেন: নিরোধক, চাপ, কূটনীতি ও প্রণোদনা। সেটা শুধু উত্তর কোরিয়ার হুমকি সামাল দিতে নয়, দেশটিতে অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রকৃত পরিবর্তন আনতেও তিনি সেটা করতে পারেন। এটা শুধু এক পরাশক্তি তার মিত্র ও প্রতিযোগীদের সঙ্গে নিয়ে করতে পারে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, অনূদিত