
বাঙালির মাছপ্রেম সুপরিচিত—ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেই
হাতে একটি বড় কাতলা মাছ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোট চাইছিলেন শরদ্বত মুখার্জি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এমনই এক অভিনব প্রচারে নামেন তিনি।
শরদ্বত মুখার্জি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী। জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতায় থাকলেও, ৯ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই রাজ্যে বিজেপি কখনোই সরকার গঠন করতে পারেনি।
ভোটারদের প্রণাম করার সময় তার হাতে ধরা কাতলা মাছটি হুকসহ দুলতে থাকে। বড় প্রশ্ন হলো—এই মাছ কি ভোটের ফলও দোলাতে পারবে?

বাঙালির মাছপ্রেম সুপরিচিত—ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেই।
এখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মাছ রান্নাঘর ছেড়ে উঠে এসেছে রাজনৈতিক ময়দানে। নেতারা নানা উপায়ে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ কেউ আশঙ্কা দূর করতে চাইছেন যে তাদের জয় বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে কী ঘটছে?
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোট দেবেন। মোট ২৯৪ জন বিধায়ক নির্বাচিত হবেন। ফলাফল ঘোষণা হবে ৪ মে। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় ৯১ লাখ নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ লাখ মানুষ তাদের নাম পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেছেন।
আরেকটি বড় ইস্যু হলো পরিচয় রাজনীতি। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন, প্রচারে বারবার দাবি করেছেন—বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ, মাংস এমনকি ডিমও নিষিদ্ধ করতে পারে। তিনি এটিকে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে তুলে ধরছেন। যদিও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী মনে করেন, ‘মাছকে ঘিরে এই পুরো ইস্যুটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তৈরি করেছেন।’ তার মতে, বিজেপি এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে উল্টো শাসক দলকেই সুবিধা করে দিয়েছে।
কেন মাছ এত গুরুত্বপূর্ণ?
কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উৎসা রায় বলেন, ‘ভৌগোলিক কারণেই বাংলায় মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী ও সাগরের কাছাকাছি হওয়ায় মাছ সহজলভ্য।’ তিনি আরও জানান, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নানা আচার-অনুষ্ঠানে মাছের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
একটি ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার মাছ খান। এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল বাঙালি আঞ্চলিক পরিচয়কে জোরদার করতে মাছকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
খাদ্য নিয়ে বিজেপির অবস্থান কী?
নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যে মাছ খাওয়ার মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছেন। এক পর্যায়ে তারা এক শীর্ষ নেতাকে ক্যামেরার সামনে মাছ খাওয়াতেও নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীলাঞ্জন সরকার বলেন, ‘খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে আমিষ খাওয়া নিয়ে বিজেপির রাজনীতি অনেকদিন ধরেই বিতর্কিত।’ উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মাংস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা এবং গরুর মাংস নিয়ে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে বাংলায় এই ধরনের রাজনীতি খুব একটা কার্যকর নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনী প্রচারে মাছের ব্যবহার এক নতুন ও অদ্ভুত মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মনে নতুন ইমেজ তৈরি করতেই এমন অভিনব প্রচারের আশ্রয় নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো।
আল জাজিরা অবলম্বনে
বাংলা টেলিগ্রাফ পর্যবেক্ষণ





































