
যান্ত্রিক ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বইয়ের পাতার সেই পরিচিত ঘ্রাণ
ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলো আর সামাজিক মাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের যুগে আমরা কি নিজেদের অজান্তেই যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি? একটার পর একটা নোটিফিকেশন আর যান্ত্রিক ব্যস্ততার ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে বইয়ের পাতার সেই পরিচিত ঘ্রাণ। অথচ একসময় বই-ই ছিল মানুষের অবসরের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। আজ ২৩ এপ্রিল, বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস। ১৯৯৫ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে এই দিনটি। মূলত পঠন-পাঠন, প্রকাশনা ও লেখকের মেধাস্বত্ব বা কপিরাইট রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতেই এই আয়োজন।
ইতিহাসের পাতায় বিশ্ব বই দিবস
বিশ্ব বই দিবসের শেকড় পোঁতা আছে স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলে। সেখানে সেন্ট জর্জ দিবস উপলক্ষে প্রিয়জনকে বই উপহার দেওয়ার একটি প্রথা আগে থেকেই ছিল। তবে আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন স্প্যানিশ লেখক ভিসেন্টে ক্লাভেল আন্দ্রেস।
পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গ্রন্থ সম্মেলনে ইউনেস্কো প্রথম একটি ‘পড়ুয়া সমাজ’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালের প্যারিস অধিবেশনে ২৩ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২৩ এপ্রিল তারিখটি বেছে নেওয়ার আরও একটি বিশেষ কারণ আছে—এই একই দিনে বিশ্বসাহিত্যের দুই দিকপাল উইলিয়াম শেক্সপিয়র এবং মিগুয়েল দে থের্ভান্তেস মৃত্যুবরণ করেছিলেন।


নিয়মিত পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্ককে সচল রাখে
কপিরাইট ও লেখকের অধিকার
দিবসটির পূর্ণ নাম ‘বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস’। বই পড়ার পাশাপাশি এর অন্যতম লক্ষ্য হলো লেখকের মেধাস্বত্ব বা কপিরাইট রক্ষা করা। একজন লেখক যখন তার মেধা ও মনন দিয়ে একটি বই লেখেন, তার ওপর তার পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করাই এই দিবসের লক্ষ্য। কপিরাইট আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হলে প্রকাশনা শিল্প যেমন বাঁচে, তেমনি নতুন লেখক তৈরিতেও উৎসাহ তৈরি হয়।
কেন বই পড়া প্রয়োজন?
গবেষণায় দেখা গেছে, বই শুধু তথ্যের উৎস নয়, এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও মহৌষধ:
মানসিক চাপ কমায়: মাত্র ৬ মিনিট বই পড়লে মানুষের মানসিক চাপ প্রায় ৬৮% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
মস্তিষ্কের ব্যায়াম: নিয়মিত পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্ককে সচল রাখে, মনোযোগ বাড়ায় এবং ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমায়।
কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা: স্ক্রিনের ভিডিও আমাদের কল্পনাকে সীমাবদ্ধ করে দেয় কিন্তু বই পড়ার সময় মস্তিষ্ক নিজেই চরিত্র ও দৃশ্য তৈরি করে, যা মানুষের কল্পনাশক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সহমর্মিতা বৃদ্ধি: ফিকশন বা গল্প পড়লে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়, যা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে আরও বেশি মানবিক করে তোলে।
যান্ত্রিকতা কাটিয়ে বইয়ের ভুবনে
বাংলাদেশেও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন দিবসটি পালন করছে। পাঠাগার আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, মোবাইল ফোনের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে বইয়ের পাতাই হতে পারে শ্রেষ্ঠ আশ্রয়।
ব্যস্ত জীবনের মাঝেও প্রতিদিন অন্তত কয়েক পাতা বই পড়া আমাদের ভেতরের ক্লান্তি কমিয়ে চিন্তার জগতকে করতে পারে উন্মুক্ত। তাই আজ এই বিশেষ দিনে নিজেকেই প্রশ্ন করুন—শেষ কবে একটি বই হাতে নিয়ে সময়ের হিসাব ভুলে গিয়েছিলেন? যদি উত্তরটা অনেক আগের হয়, তবে আজই শুরু হোক বইয়ের সাথে সেই পুরনো বন্ধুত্বের নতুন যাত্রা।
ভিজুয়াল স্টোরি









































