বৃহস্পতিবার । এপ্রিল ২, ২০২৬
সেতু ইসরাত ফিচার ১ এপ্রিল ২০২৬, ৩:০৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

এপ্রিল ফুল: ক্যালেন্ডারের গোলকধাঁধা থেকে ইতিহাসের ‘মিথ’ ভাঙার গল্প


April fool

বোকা বানানোর জন্য ১ এপ্রিলকে কেন বেছে নেওয়া হলো

প্রতি বছর এপ্রিলের প্রথম দিনটি এলে আমরা অনেকেই একে অপরকে বোকা বানিয়ে আনন্দ পাই। কিন্তু বোকা বানানোর জন্য এই দিনটিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? এর পেছনে যেমন রয়েছে ঐতিহাসিক সত্য, তেমনি ডালপালা মেলেছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা ও লোককথা। চলুন, কুয়াশাচ্ছন্ন ইতিহাসের পাতা থেকে খুঁজে আনা যাক এপ্রিল ফুলের আসল রহস্য।

ক্যালেন্ডারের সংস্কার ও ‘এপ্রিল ফিশ’
এপ্রিল ফুল নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যুক্তিটি হলো ১৫৬৪ সালের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন। ফ্রান্সের রাজা নবম চার্লস যখন পুরোনো ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ বদলে ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ চালু করেন, তখন নববর্ষের তারিখ ১ এপ্রিল থেকে পিছিয়ে ১ জানুয়ারিতে চলে আসে।

সে যুগে আজকের মতো দ্রুত খবর পৌঁছানোর মাধ্যম ছিল না। ফলে অনেক গ্রামবাসী এই পরিবর্তনের খবর জানতেন না, আবার কেউ কেউ খবর জানলেও পুরোনো প্রথা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তারা ১ এপ্রিলেই নববর্ষ পালন করতে থাকেন। যারা নতুন পদ্ধতিতে ১ জানুয়ারি উৎসব শুরু করেছিলেন, তারা এই ‘পুরনো পন্থীদের’ উপহাস করতে শুরু করেন। মজা করে তাদের পিঠে কাগজের তৈরি মাছ আটকে দেওয়া হতো। ফরাসি ভাষায় একে বলা হয় ‘Poisson d’Avril’ বা ‘এপ্রিল ফিশ’। আজও ফ্রান্সে যারা বোকা বনে যায়, তাদের এই নামেই ডাকা হয়।

April fool

ফ্রান্সে যারা বোকা বনে যায়, তাদের এপ্রিল ফিশ নামেই ডাকা হয়

গ্রানাডা ট্র্যাজেডি: ইতিহাস বনাম মিথ
মুসলিম সমাজে এপ্রিল ফুল নিয়ে একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক কাহিনী প্রচলিত আছে। দাবি করা হয়, ১৪৯২ সালের ১লা এপ্রিল স্পেনের গ্রানাডায় রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রানি ইসাবেলা মুসলিমদের ধোঁকা দিয়ে মসজিদে আটকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। দাবি করা হয়, ৭ লক্ষাধিক মুসলিমকে সে দিন পুড়িয়ে মারা হয়েছিল কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল বলছে অন্য কথা।

প্রকৃত ইতিহাস হলো, গ্রানাডার পতন হয়েছিল ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারি, ১ এপ্রিল নয়। সেদিন শেষ মুসলিম শাসক আবু আব্দুল্লাহ শান্তিপূর্ণভাবে চাবি হস্তান্তর করেছিলেন। স্পেনে মুসলিমদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের ইতিহাস সত্য এবং করুণ কিন্তু তার সাথে ১লা এপ্রিল বা ‘এপ্রিল ফুল’ রীতির কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। স্পেনে মুসলিম নিধন তীব্রতর হয়েছিল মূলত ১৫০৮ সালের পর থেকে। তাই ১ এপ্রিলের ট্র্যাজেডি হিসেবে যে গল্পটি প্রচলিত, তা ঐতিহাসিকভাবে একটি ‘মিথ’ বা বানোয়াট কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়।

গথামবাসীর ‘সফল বোকামি’ ও রোমান পুরাণ
ব্রিটিশ লোককথা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ শতকে নটিংহ্যামশায়ারের ‘গথাম’ শহরের বাসিন্দারা এক অদ্ভুত চাল চেলেছিল। নিয়ম ছিল, রাজা যেখানে পা রাখবেন সেটি রাজকীয় সম্পত্তি হয়ে যাবে। নিজেদের জমি বাঁচাতে গথামবাসী রাজার সৈন্যদের সামনে পাগলের মতো অভিনয় শুরু করে। কেউ ঝুড়িতে পানি ভরছিল, কেউ আবার গাছে চড়ে মাছ ধরছিল! তাদের এই ‘বোকামি’ দেখে রাজা দয়া করে তাদের ছেড়ে দেন। ব্রিটিশরা বিশ্বাস করে, সেই সফল বোকামি স্মরণেই এই দিনটি পালিত হয়।

আবার রোমান পুরাণে আছে, পাতালপুরীর দেবতা প্লুটো যখন পারসিফনকে অপহরণ করেন, তখন তাঁর মা সেরিস তাঁকে হন্যে হয়ে মাটির ওপর খুঁজছিলেন। মাটির নিচে থাকা মেয়েকে মাটির ওপরে খোঁজা ছিল এক বৃথা চেষ্টা—যা এক ধরণের বোকামি হিসেবেই চিহ্নিত হয়।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
কেউ কেউ একে মহাপ্লাবনের ঘটনার সাথে মেলাতে চান। হযরত নূহ (আ.) যখন পানি কমছে কি না দেখতে কবুতর পাঠিয়েছিলেন, তখন ডাঙা না পেয়ে কবুতরের ফিরে আসাকে একটি ‘বিফল প্রচেষ্টা’ হিসেবে দেখা হয়। কেউ কেউ একে এপ্রিল ফুলের সাথে মিলিয়ে দেন। এছাড়া ১৫৭২ সালের ১ এপ্রিল ডাচ বিদ্রোহীরা স্প্যানিশ লর্ড আলভাকে এক চরম রাজনৈতিক ও সামরিক শিক্ষা দেয়, যা ইতিহাসের পাতায় তাঁকে চিরকালের জন্য ‘বোকা’ বানিয়ে রেখেছে। স্প্যানিশ এই গভর্নর ডাচ বিদ্রোহীদের অতি তুচ্ছ জ্ঞান করে ‘ডেন ব্রিএল’ শহর রক্ষায় চরম অবহেলা করেছিলেন। বিদ্রোহীরা যখন অতর্কিত আক্রমণ করে শহরের বাঁধ খুলে দেয়, তখন অপ্রস্তুত স্প্যানিশ সৈন্যরা পালানোর পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। ডাচদের কাছে এই জয় এতটাই হাস্যরসের ছিল যে তারা একটি প্রবাদই বানিয়ে ফেলে— “১ এপ্রিল আলভা তাঁর চশমা হারিয়েছিলেন” (এখানে চশমা বা ‘ব্রিল’ বলতে ডেন ব্রিএল শহরকে বোঝানো হয়েছে)। লর্ড আলভার এই শোচনীয় পরাজয় আর কৌশলগত বোকামি আজও ডাচ ইতিহাসে এপ্রিল ফুলের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

April fool

ক্যালেন্ডার পরিবর্তন বা লোকজ উৎসব থেকেই এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি

আধুনিক বিশ্বের ডিজিটাল প্র্যাঙ্ক
বর্তমানে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই দিনে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে মেতে ওঠে। ১৯৮০ সালে বিবিসি খবর প্রচার করেছিল যে বিখ্যাত ‘বিগ বেন’ ঘড়িটি ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। আবার ১৯৯৬ সালে ফাস্টফুড চেইন ‘টাকো বেল’ দাবি করেছিল তারা আমেরিকার ঐতিহাসিক ‘লিবার্টি বেল’ কিনে নিয়েছে! এই নিখুঁত সব মিথ্যা খবর বিশ্বাস করে সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ বোকা বনে গিয়েছিলেন।

এপ্রিল ফুলের প্রকৃত উৎস নিশ্চিতভাবে কারো জানা নেই। তবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে আসেনি; বরং ক্যালেন্ডার পরিবর্তন বা লোকজ উৎসব থেকেই এর উৎপত্তি। স্পেনের করুণ ইতিহাস আমাদের ব্যথিত করলেও তার সাথে ১লা এপ্রিলের কৌতুককে জড়িয়ে নেওয়াটা একটি ঐতিহাসিক ভুল।

সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে কোনো বানোয়াট কাহিনী প্রচার করা মানে আমরা নিজেরাই কিন্তু এক ধরণের ‘এপ্রিল ফুল’ হয়ে যাচ্ছি। তাই মজা হোক উদার ও মার্জিত, যা সমাজের সম্প্রীতি নষ্ট করবে না।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প