
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অদৃশ্য এক সংকটের গভীরে। অনুসন্ধানে নামেন বাংলা টেলিগ্রাফের নিয়াজ মাহমুদ সাকিব এবং বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে ভর্তি যে এক সংকট তারই অন্তর্গাথা লেখেন তিনি।
ভোরবেলা। শীতের কুয়াশা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। একটি ছোট্ট শিশু, হয়তো মাত্র আট কিংবা নয় বছর বয়স, হাতে শক্ত করে ধরে আছে একটি প্রশ্নপত্র। পাশেই উদ্বিগ্ন বাবা- মায়ের চোখে প্রার্থনার ছায়া।
একটি পরীক্ষা।
একটি আসন।
একটি ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশে স্কুলভর্তি কখন যেন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থেকে রূপ নেয় এক নির্মম প্রতিযোগিতায়- যেখানে শিশুরা নয়, লড়াই করে পরিবার, স্বপ্ন, আর সামাজিক অবস্থান।
বাংলাদেশে স্কুল ভর্তি নীতিকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভর্তি পরীক্ষা’ পুনর্বহালের সম্ভাবনা এবং তার বিপরীতে ‘লটারি পদ্ধতি’ বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি-এই দুইয়ের সংঘাতে বিতর্কটি আবারও জনপরিসরে তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ: মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন, নাকি সবার জন্য সমান সুযোগ?
কিন্তু বাস্তবতা কি এত সরল?
নাকি এই প্রশ্নই আমাদের ভুল পথে চালিত করছে?
একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে- এই বিতর্কটি মূল সমস্যাকে আড়াল করছে। ভর্তি পদ্ধতি নয়, আসল সংকট লুকিয়ে আছে শিক্ষার গুণগত বৈষম্যে।
এক ভ্রান্ত দ্বন্দ্বের গল্প
আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি— ভর্তি পরীক্ষা মানেই ন্যায়। লটারি মানেই সমতা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি নীরব।
ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তি হলো—এটি মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে এবং শিক্ষার মান ধরে রাখে। অন্যদিকে, লটারি পদ্ধতি সমান সুযোগ নিশ্চিত করে, চাপ কমায়, এবং আর্থসামাজিক বৈষম্য কমাতে সাহায্য করে।
ভর্তি পরীক্ষা যেন একটি আয়না- যেখানে প্রতিফলিত হয় কেবল শিশুর মেধা নয়, তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, কোচিংয়ের সুবিধা, এবং সামাজিক পুঁজি। সেখানে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি উত্তরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসম সুযোগের দীর্ঘ ইতিহাস।
অন্যদিকে, লটারি— এক অদ্ভুত ন্যায়বিচার। যেখানে সবাই সমান, কিন্তু কেউই নিশ্চিত মেধাবী বলে দাবি করা সম্ভব নয়। এটি চাপ কমায়, কিন্তু দিকনির্দেশনা ছাড়া। এটি সুযোগ দেয়, কিন্তু সক্ষমতা তৈরি করে না। এই দুই পদ্ধতিই মূলত একই সমস্যার ভিন্ন রূপ— দুটিই সীমিত সুযোগ বণ্টনের কৌশল, কিন্তু সুযোগের অভাব দূর করে না।
অর্থাৎ,
• ভর্তি পরীক্ষা = দক্ষ বণ্টন, কিন্তু বৈষম্য বৃদ্ধি
• লটারি = সমতা, কিন্তু কার্যকারিতার প্রশ্ন
ফলে, দুটি পথ-দুটি দর্শন- কিন্তু গন্তব্য একই: একই অসমতার পুনরাবৃত্তি। সংকট থেকে যায় অমীমাংসিতই।
শিক্ষার ভেতরের অদৃশ্য ফাটল
সমস্যাটি কোথায়? এটি কোনো পরীক্ষার প্রশ্নে নয়। কোনো লটারির ফলাফলেও নয়। সমস্যাটি লুকিয়ে আছে আরও গভীরে— বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব স্তরবিন্যাসে।
কিছু স্কুল—আলোয় ভরা। সেখানে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক সুবিধা, এবং সাফল্যের গল্প।
আর অধিকাংশ স্কুল— অন্ধকারে নয়, কিন্তু আলো থেকে অনেক দূরে।
একই পাঠ্যবই, একই কারিকুলাম— কিন্তু শেখানোর ভঙ্গি, পরিবেশ, আর সম্ভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একটি শ্রেণিকক্ষে ৬০ জন শিক্ষার্থী, একজন ক্লান্ত শিক্ষক— আর অন্য কোথাও, ৩০ জন শিক্ষার্থী, একজন অনুপ্রাণিত পথপ্রদর্শক।
এই বৈষম্যই তৈরি করে সেই ভয়ঙ্কর সত্য: সব স্কুল সমান নয়। তাই সব ভর্তি সমান হতে পারে না।
তাত্ত্বিকভাবে মেধাতন্ত্র (meritocracy) একটি আদর্শ ধারণা—যেখানে পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে?
বাংলাদেশের মতো সমাজে এই ধারণা প্রায়শই ভেঙে পড়ে।
গবেষণাটি দেখায়—
• কোচিং সেন্টারের প্রবল বিস্তার
• উচ্চবিত্ত পরিবারের বাড়তি প্রস্তুতি সুবিধা
• অভিভাবকের শিক্ষাগত পটভূমি
এসবই ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
ফলে, পরীক্ষা একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নয়; বরং এটি সামাজিক সুবিধাকে “মেধা” হিসেবে বৈধতা দেয়।
লটারি: সমতা আছে, দিকনির্দেশনা নেই। লটারি পদ্ধতি অনেকাংশে স্বচ্ছ ও চাপমুক্ত। কিন্তু এটিও সমস্যামুক্ত নয়। গবেষণার ভাষায়, এটি “equity without effectiveness”— অর্থাৎ, সুযোগ সমান হলেও ফলাফল কার্যকর নয়।
কারণ—
• শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি বা আগ্রহ বিবেচিত হয় না
• স্কুল ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে
• শিক্ষার মান উন্নয়নে কোনো অবদান রাখে না
এটি কেবল সুযোগ পুনর্বণ্টন করে, কিন্তু নতুন সুযোগ তৈরি করে না।
শিশুরা কোথায় হারিয়ে যায়?
এই প্রতিযোগিতার ভিড়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই— এটি শিশুদের গল্প। একটি শিশু, যে হয়তো আঁকতে ভালোবাসে,
আরেকটি শিশু, যে গল্প বলতে পারে— তারা সবাই একই প্রশ্নপত্রের সামনে বসে, একই মাপকাঠিতে বিচারিত হয়।
আর যারা ব্যর্থ হয়? তারা কি কম সম্ভাবনাময়? নাকি তারা কেবল একটি অসম যাত্রার যাত্রী?
ভর্তি পরীক্ষা তাদের শেখায়— “তুমি যথেষ্ট নও।”
আর লটারি শেখায়— “তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ভাগ্যের ওপর।”
দুটোই কি কোনো শিশুর জন্য ন্যায়সংগত বার্তা?
তথ্য যা বলছে: সংকট কাঠামোগত
গবেষণায় ব্যবহৃত BANBEIS, UNESCO এবং NCTB-এর তথ্য অনুযায়ী—
• ৭৫% এর বেশি শিক্ষার্থী অতিরিক্ত শিক্ষার্থীতে ভরা ক্লাসরুমে পড়ে
• অনেক এলাকায় ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি
• গ্রামাঞ্চলে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব প্রকট
• একই কারিকুলাম থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ব্যাপক পার্থক্য
অর্থাৎ, সমস্যা ভর্তি পদ্ধতিতে নয়—সমস্যা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতরে।
ফিনল্যান্ড: এক অন্য সম্ভাবনার গল্প
পৃথিবীর এক কোণে, ফিনল্যান্ডে, এই গল্পটি ভিন্নভাবে লেখা হয়েছে। সেখানে নেই ভর্তি পরীক্ষা। নেই লটারি। নেই ‘ভালো স্কুলে ঢোকার যুদ্ধ’। তবুও সফল তারা। কারন তারা সমস্যাটিকে অন্যভাবে দেখেছে। মূল জায়গায় কাজ করেছে।
তারা প্রতিযোগিতা বন্ধ করেনি— তারা প্রতিযোগিতার প্রয়োজনই কমিয়ে দিয়েছে। প্রতিটি স্কুলই প্রায় সমান মানের। প্রতিটি শিক্ষক দারুণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এবং প্রতিটি শিশুই গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না
সে কোন স্কুলে ভর্তি হলো তার ওপর।
• সব স্কুলে প্রায় সমমানের শিক্ষা
• শিক্ষক হতে হলে উচ্চতর ডিগ্রি এবং শিক্ষাদান সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক
• শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃত সেখানে- অন্য ভাষায়- বেতন অনেক? ফলাফল মোটিভেশন ও অনেক।
• সম্পদের সমান বণ্টন
ফলে সেখানে ‘ভালো স্কুলে ভর্তি’ হওয়ার প্রতিযোগিতার প্রয়োজনই পড়ে না। অর্থাৎ, তারা প্রতিযোগিতা বন্ধ করেনি—প্রতিযোগিতার প্রয়োজনই কমিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ: এক অসম বাস্তবতা
বাংলাদেশে চিত্রটি উল্টো। এখানে ভালো স্কুল মানে সুযোগ, আর অন্য স্কুল মানে আপোস। ফলে তৈরি হয় এক চক্র—
সীমিত ভালো স্কুল
অসংখ্য আবেদন
তীব্র প্রতিযোগিতা
ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি
অসন্তোষ, বৈষম্য, পুনরাবৃত্তি। এই চক্র ভাঙা না গেলে, নীতির পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক রং বদলাবে- মূল কাঠামো নয়।
সমাধান: নির্বাচন নয়, নির্মাণ (সক্ষমতা বৃদ্ধি)
আমরা এতদিন ধরে “কে ভর্তি হবে” প্রশ্নটি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্নটি হওয়া উচিত— ‘কোথায় ভর্তি হবে?’ যদি প্রতিটি স্কুলই মানসম্মত হয়, তবে ভর্তি প্রক্রিয়া আর যুদ্ধ হবে না- হবে একটি স্বাভাবিক পদক্ষেপ।
তাই প্রয়োজন মৌলিক পরিবর্তন:
• শিক্ষককে কেন্দ্র করে শিক্ষা সংস্কার
• সব স্কুলে সমান মান নিশ্চিত করা
• অবকাঠামো ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন
• শৈশব থেকে প্রতিযোগিতার চাপ কমানো
এক কথায় , ভর্তি পদ্ধতি নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে
এর জন্য প্রয়োজন—
১. শিক্ষক-কেন্দ্রিক সংস্কার
• কঠোর নিয়োগ প্রক্রিয়া
• মানসম্মত প্রশিক্ষণ
• নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন
• উপযুক্ত বেতন ও প্রণোদনা
২. প্রতিষ্ঠানগত বৈষম্য কমানো
• অবকাঠামোর মান সমান করা
• গ্রাম-শহর ব্যবধান কমানো
• স্বচ্ছ অর্থায়ন
৩. স্বল্পমেয়াদি সমাধান: হাইব্রিড মডেল
• কম চাপের মূল্যায়ন
• আংশিক লটারি
• বয়স-উপযোগী বাছাই
৪. শৈশব শিক্ষায় চাপ কমানো
• কোচিং নির্ভরতা কমানো
• খেলাধুলা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা
• সামগ্রিক বিকাশে জোর
শেষ দৃশ্য: এক সম্ভাবনার স্বপ্ন
কল্পনা করুন— একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো শিশুকে “ভালো স্কুলে” ভর্তি হবার জন্য লড়াই করতে হয় না। যেখানে একটি গ্রাম্য স্কুল এবং একটি শহুরে স্কুল- দুটোই একই স্বপ্ন বুনে যায়। যেখানে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে না তার ভাগ্য বা পরীক্ষার ফলাফলের ওপর,
বরং নির্ভর করে তার শেখার সুযোগের ওপর।
সেই দিন, ভর্তি পরীক্ষা এবং লটারি— দুটোই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। কারন তখন, আমরা অবশেষে বুঝবো সমস্যা কখনোই নির্বাচনী পদ্ধতি ছিল না। সমস্যা ছিল অসমতা। আর সমাধান? সেটি লুকিয়ে আছে— একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক, এবং মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্নে।
আমরা এতদিন ভুল প্রশ্ন করেছি:
‘ভর্তি পরীক্ষা ভালো, না লটারি?’
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত:
‘কেন ভালো স্কুল এত কম?’
যে সমাজে ভালো শিক্ষার জন্য শিশুদের প্রতিযোগিতা করতে হয়, সেই সমাজ ইতিমধ্যেই সমান সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং, সমাধান কোনো একটি পদ্ধতি বেছে নেওয়ায় নয়; সমাধান হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি স্কুলই ‘ভালো স্কুল’।
ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তন সহজ। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার কঠিন। তবুও, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান একটিই: শিক্ষার গুণগত মান সর্বজনীন করা। তখনই হয়তো একদিন আমরা দেখব— ভর্তি নিয়ে আর কোনো বিতর্কই নেই।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প










































