
পূর্ব এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ শহর, ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্ট, একাকিত্ব এবং ব্যস্ত কর্মজীবন মানুষকে বিড়ালের দিকে বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করছে।
আপনি কি বিড়ালপ্রেমী, নাকি কুকুরপ্রেমী? — বহু পুরোনো এই প্রশ্নের উত্তর যেন বদলে যাচ্ছে পূর্ব এশিয়ায়। অঞ্চলজুড়ে এখন ক্রমেই বাড়ছে বিড়াল পালনের প্রবণতা।
তাইওয়ানে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো পোষা বিড়ালের সংখ্যা কুকুরকে ছাড়িয়ে গেছে বলে সরকারি এক জরিপে জানা গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে পোষা বিড়ালের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ, সেখানে গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখে—অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ।
একই ধরণের প্রবণতা দেখা গেছে চীনেও। চীনে ২০২১ সালেই বিড়ালের সংখ্যা কুকুরকে ছাড়িয়ে যায়। জাপানে এই পরিবর্তন শুরু হয়েছিল আরও আগে—প্রায় এক দশক আগে থেকেই সেখানে কুকুরের তুলনায় বিড়াল বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ের মতো জায়গায় এখনও কুকুর বেশি থাকলেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বিড়াল।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ব এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ শহর, ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্ট, একাকিত্ব এবং ব্যস্ত কর্মজীবন মানুষকে বিড়ালের দিকে বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করছে। শহরে বিড়াল পালন অনেক বেশি সুবিধাজনক। কুকুরকে নিয়মিত হাঁটাতে নিয়ে যেতে হয়, অনেকের সে সময় নেই। আবার কেউ কেউ কুকুরকে ভয়ও পান। এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ।
সন্তান নয়, এখন ‘পোষ্যই পরিবার’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কারণে পূর্ব এশিয়ায় জন্মহার কমছে, ঠিক সেই কারণেই মানুষ পোষা প্রাণীর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। অনেক মানুষ এখন সন্তান নিতে চাইছেন না। তাই পোষা প্রাণী অনেকটা সন্তানের বিকল্প হয়ে উঠছে। আর শহুরে জীবনের চাপ ও সীমাবদ্ধতা মানুষকে কুকুরের বদলে বিড়াল পালনে বেশি আগ্রহী করছে।

একাকিত্ব ও মানসিক চাপের প্রভাব
পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তরুণরা কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছেন। কিন্তু শহুরে জীবনে রয়েছে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং মানসিক চাপ।
চীনে অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ২০২১ সালে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাপানে ‘অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যু’ বোঝাতে আলাদা শব্দও রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন বাস্তবতায় বিড়াল অনেকের কাছে সহজ ও মানসিক স্বস্তির সঙ্গী হয়ে উঠছে। কারণ বিড়াল ছোট জায়গায় সহজে মানিয়ে নিতে পারে এবং কুকুরের মতো নিয়মিত বাইরে নিয়ে যেতে হয় না।

একাকিত্ব কমাতে পোষ্য
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একক পরিবার বাড়ছে, কমছে বিয়ে ও সন্তান জন্মের হার। এর সঙ্গে বাড়ছে একাকিত্বও। জাপানে ‘হিকিকোমোরি’ নামে পরিচিত এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, যেখানে অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় ঘরে বন্দি থাকেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় একাকিত্ব মোকাবিলায় সরকার কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের কর্মসূচিও নিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ সঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন পোষা প্রাণীকে। ফলে এশিয়াজুড়ে দ্রুত বাড়ছে ‘পেট ইকোনমি’ বা পোষা প্রাণীভিত্তিক বাজার।
গোল্ডম্যান স্যাকসের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে পোষা প্রাণীর খাবারের বাজার দ্রুত বাড়ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এর মূল্য ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো শিশুদের স্ট্রলারের চেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পোষা প্রাণীর স্ট্রলার।











































