রবিবার । মে ১০, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব খেলা ১০ মে ২০২৬, ৪:১৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

আর্জেন্টিনার বিজয়ী বেশের কাব্যিক সিম্ফনি: শেষ নৃত্যের প্রাক্কালে এক মহাকাব্য


Argentina Cover

এবারের আর্জেন্টিনা যেন এগিয়ে চলা এক বহমান মহাকাব্য-যেখানে ইতিহাস, উত্তরাধিকার, এবং সময়ের নির্মম স্রোত একসঙ্গে বুনে দিচ্ছে এক অনিবার্য কোনো পরিণতির গল্প

বিজয়ঘন নস্টালজিয়া নাকি সম্ভাব্য পতনের সুরের উদ্বেগ নাকি লাস্ট ড্যান্স অফ লিওনেল মেসি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা সাফল্যের পর আর্জেন্টিনা ২০২৬ টুর্নামেন্টে প্রবেশ করবে বীর-দর্পে মহাদেশীয় ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই , ‘উইনিং মেশিন’ রূপে আত্মপ্রকাশ।

তারা হতে চেয়েছিলো কবিতার সেই লাইন- এই কাফেলা রুখতে পারে সাধ্য কার,
এই কাফেলা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া বাধ্য কার। তারা বলতে চেয়েছিলো- কে আজ পৃথিবী-রাজ?
জলে স্থলে ব্যোমে, কার রাজ্যপাট?” তারা তো ফুটবল রাজ্যের রাজাধিরাজই বটে ২০২৬ এর এই দফা।

এবারই বিশ্বকাপে প্রথম বারের মতো ১২ গ্রুপে মোট ৪৮ টি দেশ অংশ নিতে যাচ্ছে। তবে এবারের আর্জেন্টিনা যেন এগিয়ে চলা এক বহমান মহাকাব্য-যেখানে ইতিহাস, উত্তরাধিকার, এবং সময়ের নির্মম স্রোত একসঙ্গে বুনে দিচ্ছে এক অনিবার্য কোনো পরিণতির গল্প। এই গল্পের কেন্দ্রে আছে এক “মূল কেন্দ্রবিন্দু”- একটি নক্ষত্রমণ্ডল, যাদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে দলের আত্মা, ছন্দ, এবং অস্তিত্ব।

লিওনেল মেসি- সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক শেষ কবিতা। তার পায়ে বল মানেই শুধু খেলা নয়, স্মৃতির পুনর্লিখন। তিনি একজন প্লেমেকার নন; তিনি আর্জেন্টিনার ভাষা, তাদের স্বপ্নের ব্যাকরণ।
এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ- গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রহরী, যার চোখে প্রতিফলিত হয় যুদ্ধের দৃঢ়তা।
এনজো ফার্নান্দেজ- মাঝমাঠে সময় ও স্থানকে নিয়ন্ত্রণ করা এক নির্মাতা, যিনি খেলার স্থপতি।
অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার- এক অবিরাম গতি, যেন মাটির নিচে প্রবাহিত অদৃশ্য স্রোত, যাকে থামানো যায় না।
ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো- রক্ষণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীর, যার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের সাহসকে নিঃশব্দে ভেঙে দেয়।

এই পাঁচজন—‘বিগ ফাইভ’—আসলে পাঁচটি আলাদা শক্তির প্রতীক, কিন্তু তাদের সম্মিলনেই তৈরি হয় এক অদৃশ্য ভারসাম্য, যা দলকে করে তোলে সম্পূর্ণ।
কিন্তু কোনো মহাকাব্যই কেবল নায়ক তথা কেন্দ্রীয় চরিত্রের একক কারিকুরি নয়; তার প্রয়োজন হয় সহযোদ্ধাদের—যারা ছায়ার মতো পাশে থাকে, অথচ প্রয়োজনের মুহূর্তে হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় চরিত্র।

হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ—গোলের ভাষায় কথা বলা দুই আক্রমণভাগের কবি।

লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নাহুয়েল মোলিনা, ওতামেন্দি, তাগলিয়াফিকো—অভিজ্ঞতার স্তম্ভ, যারা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এখনো লড়াইয়ের অগ্রভাগে। এর মধ্যেই ধীরে ধীরে উঠে আসছে এক নতুন ভোরের আভা। নিকো পাজ, ভ্যালেন্টিন বারকো, ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনো—তারা এখনো পুরোপুরি গল্পের কেন্দ্র দখল করেনি, কিন্তু তাদের পদচারণায় শোনা যায় আগামীর প্রতিধ্বনি। তারা যেন ভবিষ্যতের অনুচ্ছেদ, যা এখনো লেখা হয়নি, কিন্তু যার সম্ভাবনা ইতোমধ্যেই অনুভব করা যায়।

Argentina Inner 1

ওমর খৈয়াম বলেছিলেন-‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত- যৌবনা- যদি তেমন বই হয়।’ যদি লাইনগুলো ফুটবলের মিশেলে চিন্তা করা হয়, তাহলে হয়তো কথাটা এমনভাবেও বলা সম্ভব- রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু গোলটা যদি হয় লিওনেল মেসির, তবে তা চিরযৌবনা আর সে গোলের মুগ্ধতার রেশ কাটতে লেগে যাবে বহুকাল।

দ্যা লিটল বয় ফ্রম রোজারিও তো স্বর্গ ছুঁয়ে নিয়েছে সর্বশেষ ফুটবল বিশ্বকাপ নিজের করে নিয়ে কিন্তু শুরুটা সেই ধারাভাষ্যকারের দ্যা বয় ওয়ান্ডার , অনলি এইটিন ইয়ারস অফ এইজ, ইজ অ্যাবাউট টু এন্টার দ্যা ওয়ার্ল্ড কাপ দিয়ে। মাস্তান্তুনো আর্জেন্টিনার সবথেকে কম বয়সে ডেব্যু হলেও ওয়ার্ল্ড কাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সবথেকে তরুণ তুর্কী এখনও মেসি। সমীকরণের আক্ষরিক অর্থেও আবার ভাবার্থ মেলালেও।

আর্জেন্টিনা সেই ১৯৭৮, ১৯৮৬-তে জিতে নিয়েছিলো বিশ্বকাপ, এরপর ৯০ তে আবার রানার আপ। ৮৬ র ম্যারাডোনা ৯০ তে ফাইনাল হেরে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিলেন দেশবাসীর কাছে। মেসির কাছ থেকেও তো এমন দৃশ্য সবাই দেখেছে দু একবার। তবে ফুটবল স্বর্গ ছোঁয়া মেসি এবার কি বাইশের পর ছাব্বিশে এসে সেই দৃশ্যপট বদলাতে পারবেন?

তবে ২০২৬ এর মে মাস নাগাদ, লিওনেল মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবেন কি না তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদিও আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি তার অংশগ্রহণের আশা করছেন, তবে সাথে এ ও বলেছেন যে,মেসির সিদ্ধান্ত তার শারীরিক অবস্থা ও ফর্মের ওপর নির্ভর করছে। ৩৯ বছর বয়স হওয়া সত্ত্বেও এবং আগেও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও, মেসি তো মেসিই। পারফরম্যান্সে যেন সে এখনও নবযৌবনা টগবগে যুবক, ফুটবলের জীবনীতে চিরতরুণ বললেও অত্যুক্তি হবার কথা নয়। তাই, মেসিকে ২৬ এর বিশ্বকাপে দেখাও অবাক হবার নয়!

৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি কি আরেকটি শেষ সাফল্যের ঝলক দেখাতে পারবেন? স্কালোনি এবার যেন মাস্টারমাইন্ড বনে গেলেন এক ঝাঁক তরুণ মুখ নিয়েই। যদিও মেসিই মূল কেন্দ্রবিন্দু, তবুও কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলের বিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতিভা—নিকো পাজ, ক্লদিও এচেভেরি এবং ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনো—কে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, পাশাপাশি অভিজ্ঞ খেলোয়াড় যেমন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং রদ্রিগো দে পলকেও রেখেছেন।

আর্জেন্টিনার লক্ষ্য হলো ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখা। আর্জেন্টিনা অবশ্য এমন অর্জনকে স্বপ্ন বলেই বিবেচনা করছে এখনো। কে জানে যদি এ স্বপ্ন আবার সত্যি হয়ে যায় তবে কেমন হবে?

Argentina Inner 2

আর আর্জেন্টিনাকে বলা হচ্ছে- ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘প্যাক অফ ওল্ভস’ – তথা- নেকড়ের দল। এই নেকড়ের সঙ্গে গ্রুপ পর্বে দেখা হচ্ছে গ্রুপ ‘জে’- এর অন্যান্য দল আলজেরিয়া, জর্ডান আর অস্ট্রিয়ার সঙ্গে। এবং এই গ্রুপে জর্ডান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। সুতরাং, আর্জেন্টিনাকে পরিষ্কারভাবেই ফেভারিট ধরা যেতে পারে।

২০২২-এর বিজয়ী দল ছিল এক পূর্ণবৃত্ত; ২০২৬-এর দল সেই বৃত্তের ওপর নতুন রেখা আঁকছে। কিছু চরিত্র বিদায় নিয়েছে—দী মারিয়ার মতো—তাদের জায়গায় এসেছে নতুন মুখ, নতুন শক্তি। কিন্তু ‘উইনিং ডিএনএ’—জয়ের যে অদৃশ্য জিন—তা এখনো প্রবাহিত, শুধু রূপ বদলেছে।

আর সবকিছুর ওপরে, যেন এক অনিবার্য প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ভাসছে মেসির উপস্থিতি। তিনি খেলবেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। এটি শারীরিক সক্ষমতার চেয়েও বেশি কিছু; এটি মানসিক শান্তি, আত্মার প্রস্তুতি।
তবু তিনি এখনো খেলছেন, এখনো নব্বই মিনিট জুড়ে দৌড়াচ্ছেন, এখনো গোল করছেন—যেন সময়কে অস্বীকার করে।
তাই ২০২৬ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি এক সন্ধিক্ষণ—যেখানে অতীতের গৌরব, বর্তমানের দায়বদ্ধতা, এবং ভবিষ্যতের আহ্বান একত্রে দাঁড়িয়ে আছে।
এটি হয়তো এক বিদায়, আবার এক সূচনাও।

একটি ‘লাস্ট ড্যান্স’—যেখানে প্রতিটি পাস, প্রতিটি গোল, প্রতিটি দৃষ্টি হয়ে ওঠে স্মৃতির অংশ, ইতিহাসের ভাষ্য।