রবিবার । মে ১০, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১০ মে ২০২৬, ৩:২৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

ভারত-পাকিস্তান ‘সীমিত’ যুদ্ধের এক বছর: কে কী শিখল!


 

india Pak

চার দিনের সংঘর্ষে উভয় দেশই বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে

গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সীমিত যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছিল। এক বছর পর দুই দেশই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে ওই সংঘাত কোনো পক্ষের জন্যই পূর্ণাঙ্গ জয় বয়ে আনেনি। বরং যুদ্ধ উভয় দেশের সামরিক শক্তি, দুর্বলতা এবং কৌশলগত সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে।

পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রশংসায় পোস্টার, ব্যানার ও নানা আয়োজন দেখা গেছে। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ‘সাফল্য’ উদযাপন করে অনুষ্ঠান করেছে। লাহোরেও সরকার আয়োজিত কনসার্টে যুদ্ধকে ‘সত্যের যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে ভারতেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর লোগো ব্যবহার করে দেশবাসীকে একই কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, ভারতের সেনাবাহিনী ‘অসাধারণ সাহস ও নিখুঁত সামরিক দক্ষতা’ দেখিয়েছে।

দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তারাও সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। ভারত দাবি করে তারা পাকিস্তানের ১৩টি বিমান ধ্বংস করেছে এবং ১১টি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান জানায়, তারা নিজেদের চেয়ে ‘পাঁচ গুণ বড় শত্রুকে’ পরাস্ত করেছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহেলগামে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে, যদিও ইসলামাবাদ অভিযোগ অস্বীকার করে।

এরপর ৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে পাকিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। ভারত দাবি করে, তারা ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে হামলা করেছে। পাকিস্তান পাল্টা ‘অপারেশন বুনইয়ান আল-মারসুস’ শুরু করে।

চার দিনের সংঘর্ষে উভয় দেশই বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে।

যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানের চীনা তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান ভারতীয় কয়েকটি বিমান, এমনকি রাফাল জেটও ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করা হয়। ভারতের সামরিক নেতৃত্বও পরে স্বীকার করে যে প্রথম দিনে কিছু বিমান হারিয়েছে তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছুটা সুবিধা পেয়েছিল। যুদ্ধবিরতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করে ইসলামাবাদ তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দেয়।

যুদ্ধের পর পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। তারা নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, রকেট ফোর্স এবং দূরপাল্লার হামলা সক্ষমতা জোরদার করছে। প্রতিরক্ষা বাজেটও প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভারতীয় ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পাকিস্তানের চীনা এইচকিউ-৯বি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।

অন্যদিকে ভারত যুদ্ধের সময় ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের নুর খান ও ভোলারি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। এছাড়া ইসরায়েলি ড্রোন পাকিস্তানের করাচি ও লাহোর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

ভারত আরও একটি বড় পদক্ষেপ নেয়—সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে নদীর পানি বণ্টন হতো।

তবে ভারতও কিছু প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে কতটি যুদ্ধবিমান হারিয়েছে, সে বিষয়ে সরকার স্পষ্ট তথ্য দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশই যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি গোপন রাখার চেষ্টা করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত এখন বড় ধরনের ‘সন্ত্রাসী’ হামলাকে সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে পাকিস্তানও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে।

তাদের মতে, দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনও তীব্র এবং কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থার অভাব রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ হয়ে উঠেছে পানি ইস্যু। ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখায় পাকিস্তানে শঙ্কা বাড়ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের কৃষিখাতে ব্যবহৃত ৮০ শতাংশের বেশি পানির যোগান নিশ্চিত হতো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের পানি সংরক্ষণ ক্ষমতা খুবই সীমিত।

তবে পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভারতের সিদ্ধান্ত নয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনাও বড় সমস্যা। পুরনো সেচব্যবস্থা, অনুপযুক্ত কৃষিনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশকেই ‘নীরব কূটনীতি’ ও বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতে আবার সংঘাত শুরু হলে তা খুব দ্রুত বড় আকার নিতে পারে।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল