বুধবার । মে ৬, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ৬ মে ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

কলম, ছাতা, লিপস্টিক—এগুলোও হতে পারে অস্ত্র!


Weapon Cover

আমরা অনেকেই সিনেমা বা গল্পে দেখেছি—একটা সাধারণ কলম, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কিছু। বাইরে থেকে একেবারে নিরীহ, কিন্তু আসলে সেটা একটি অস্ত্র। এই ধরনের জিনিসকে বলা হয় ছদ্মবেশী অস্ত্র (ডিসগাইজড উইপনস)। বাস্তব জীবনেও এমন অনেক অস্ত্র তৈরি হয়েছে—কিছু গুপ্তচরদের জন্য, কিছু অপরাধীদের হাতে, আর কিছু ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের কারণে।
চলুন, এই অদ্ভুত আর অন্ধকার জগতটা থেকে একটু ঘুরে আসি।

পেন গান: কলম নাকি বন্দুক?
‘পেন গান’ নামটা শুনলেই মনে হয়—একটা কলম, কিন্তু গুলি ছোঁড়ে! বাস্তবে এটা ঠিক সেটাই। দেখতে সাধারণ পেনের মতো, কিন্তু ভেতরে ছোট ক্যালিবারের বুলেট রাখার ব্যবস্থা থাকে। ট্রিগার চাপলেই গুলি বের হয়।
এই ধরনের অস্ত্র সাধারণত গুপ্তচরবৃত্তি বা গোপন অপারেশনে ব্যবহার করা হতো। কারণ, কেউ সন্দেহই করবে না—আততায়ী একটা কলম হাতে নিয়ে ঘুরছে, অথচ সেটাই মারাত্মক অস্ত্র!
তবে বাস্তব জীবনে এগুলো খুব বেশি ব্যবহার হয়নি। কারণ এগুলো খুব সীমিত ক্ষমতার এবং ব্যবহারের ঝুঁকিও বেশি। তবুও, ‘পেন গান’ মানুষের কল্পনায় এক ধরনের ভয় আর রহস্য তৈরি করে—বিশেষ করে গুপ্তচর গল্পে।

ছদ্মবেশী অস্ত্রের দুনিয়া
পেন গান শুধু একটাই উদাহরণ। আরও অনেক ধরনের ছদ্মবেশী অস্ত্র আছে, যেগুলো দেখে আমরা বুঝতেই পারব না এগুলো কতটা বিপজ্জনক।

ছাতা বন্দুক (আমব্রেলা গান)
এটা ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ছদ্মবেশী অস্ত্রগুলোর একটি। দেখতে একেবারে সাধারণ ছাতা, কিন্তু ভেতরে ছিল বিষ ছোঁড়ার মেকানিজম।
এই অস্ত্র ব্যবহার করে ১৯৭৮ সালে লন্ডনে হত্যা করা হয় জর্জি মার্কভ-কে। ঘটনাটি পরিচিত ‘জর্জি মার্কভ অ্যাসাসিনেশন’ নামে। ঘটনাটা ছিল সিনেমার মতোই—একজন লোক ছাতা দিয়ে হালকা খোঁচা দেয় মার্কভের পায়ে। প্রথমে কিছুই মনে হয়নি। কিন্তু সেই ছাতার ভেতর থেকে একটি ক্ষুদ্র প্যালেট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যার ভেতরে ছিল বিষ (রিসিন)। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।

লিপস্টিক গান
এটাকে অনেক সময় ‘কিস অব ডেথ’ বলা হয়। দেখতে একেবারে লিপস্টিক, কিন্তু ভেতরে ছোট একটি বন্দুক লুকানো।
এটা বিশেষ করে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় গুপ্তচরদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল বলে জানা যায়। যদিও এটি দিয়ে বড় কোনো কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের নির্দিষ্ট প্রমাণ খুব কম পাওয়া যায়, তবুও এর ধারণাটাই ভয়ংকর—একটা মেকআপ আইটেম, যা মুহূর্তে অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।

ব্রিফকেস গান
এটা এমন একটি ব্যাগ, যার ভেতরে বন্দুক বসানো থাকে। বাইরে থেকে মনে হবে তুমি একটা সাধারণ ব্যাগ বহন করছ, কিন্তু ভেতরে লুকানো আছে গুলি ছোঁড়ার ব্যবস্থা।
এই ধরনের অস্ত্র সাধারণত সামরিক বা বিশেষ অপারেশনে ব্যবহৃত হতো।

ঘড়ির ভেতরে অস্ত্র
কিছু ক্ষেত্রে ঘড়ির ভেতরে ছোট ব্লেড বা বিষ প্রয়োগের যন্ত্র রাখা হতো। এগুলো খুবই সীমিত ব্যবহারযোগ্য হলেও গুপ্তহত্যার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা আছে।

Weapon Inner

আরও কিছু কুখ্যাত হত্যা
ছদ্মবেশী বা অপ্রত্যাশিত অস্ত্র ব্যবহার করে ইতিহাসে আরও কিছু ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যেগুলো আজও মানুষকে শিউরে তোলে।

বিষ মেশানো পানীয়: এক চুমুকেই মৃত্যু
২০০৬ সালে লন্ডনে সাবেক রুশ গুপ্তচর আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকো-কে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি পরিচিত ‘পয়জনিং অব আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকো’ নামে।
তাকে এক কাপ চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল মারাত্মক রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ পোলোনিয়াম-২১০। প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি কী হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার শরীর ভেঙে পড়তে থাকে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মারা যান।

সুগন্ধির আড়ালে নার্ভ এজেন্ট
২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে হত্যা করা হয় কিম জং-নাম—কে। ঘটনাটি পরিচিত ‘অ্যাসাসিনেশন অব কিম জং-নাম’ নামে।
দুই নারী তার মুখে এক ধরনের তরল পদার্থ মাখিয়ে দেয়—যেটা দেখতে সাধারণ লিকুইড বা সুগন্ধির মতো লাগছিল। কিন্তু সেটি ছিল ভয়ংকর নার্ভ এজেন্ট ভিএক্স। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা যান।

কেন এসব অস্ত্র এত বিপজ্জনক?
এই ছদ্মবেশী অস্ত্রগুলো বিপজ্জনক হওয়ার মূল কারণ হলো—এগুলো সহজে ধরা পড়ে না।
একটা ছুরি বা বন্দুক দেখলে যে কেউ সতর্ক হয়ে যাবে। কিন্তু একটা কলম, লিপস্টিক বা ছাতা দেখলে তো সন্দেহই করবে না। এই ‘সারপ্রাইজ ফ্যাক্টর’-ই এগুলোকে ভয়ংকর করে তোলে।
এছাড়া, অনেক সময় এগুলো খুব কাছ থেকে ব্যবহার করা হয়। আক্রমণকারী এবং ভিকটিমের মধ্যে দূরত্ব থাকে খুব কম। ফলে পালানোর সুযোগও কমে যায়।

বাস্তবতা বনাম সিনেমা
সিনেমা আর গল্পে এই ধরনের অস্ত্র অনেক বেশি নাটকীয়ভাবে দেখানো হয়। যেমন—একটা কলম দিয়ে একাধিক গুলি ছোঁড়া বা একটি লিপস্টিক দিয়ে বড়সড় হামলা চালানো।
বাস্তবে বিষয়টা এত সহজ নয়। এসব অস্ত্র সাধারণত একবার বা খুব সীমিত ব্যবহারযোগ্য। তাছাড়া এগুলো ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রায়ই অকার্যকরও হতে পারে। তাই এগুলো বাস্তবের চেয়ে কল্পনায় বেশি ‘কুল’ মনে হয়।

কিশোরদের জন্য ভাবনার জায়গা
এই গল্পগুলো শোনার পর কারো মনে হতে পারে—“ওয়াও, কত ইন্টারেস্টিং!” কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
এই অস্ত্রগুলো তৈরি হয়েছে মানুষকে আঘাত বা হত্যা করার জন্য। এগুলো কোনো খেলনা না, কোনো মজার জিনিসও না। বরং এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ কতটা সৃজনশীল হতে পারে, আবার সেই সৃজনশীলতাই কত ভয়ংকর দিকে যেতে পারে।

তথ্যসূত্র: এভরিটাউন ফর গান সেফটি, অ্যাটলাস অবসকিউরা, দি গার্ডিয়ান, টাইম ম্যাগাজিন

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল