
আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশ নদী ও খালের দেশ। শত শত নদী, হাজার হাজার খাল- এই জলপথের জালই একসময় এ দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশকে টিকিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই খালগুলো ভরাট হয়েছে, দখল হয়েছে, হারিয়ে গেছে ভূমি ম্যাপ থেকে। ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা, কৃষির পানিসংকট- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে: পানির দেশে পানিরই সংকট।
সম্প্রতি দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খনন কর্মসূচীর উদ্বোধন করেছেন- যা অনেকের কাছে একটি রাজনৈতিক ঘটনা হলেও বাস্তবে এই ঘটনা বাংলাদেশের উন্নয়নচিন্তার গভীরে থাকা এক পুরোনো প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে:
বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি কি আমরা কখনো ঠিকমতো গড়ে তুলতে পেরেছি?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ ই মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধন শেষে খালের পাড়ে একটি গাছ লাগান তিনি।
আর প্রধানমন্ত্রীর সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলো। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জলাধার সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। খাল খননের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা জানি বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে থাকেন। কৃষির সঙ্গে অনেকে জড়িত। এজন্য আমরা মন্ত্রিসভার বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ ই মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন
কারণ ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ঠিক ৪৫ বছর আগে একই ধরনের খাল খনন কর্মসূচী শুরু করেছিলেন সেসময়কার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখনকার বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন- দেশ স্বাধীন হয়েছে বেশিদিন হয়নি, অর্থনীতি দুর্বল, অবকাঠামো সীমিত। তবুও তিনি বুঝেছিলেন, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
হ্যাঁ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে (১৯৭৭ সালের দিকে) বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত এই উদ্যোগটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকাও রেখেছিলো। দীর্ঘ এতো বছর পর, ২০২৬ সালে এই কর্মসূচির পুনর্জাগরণই ঘটলো বৈকি!
বিষয় তথ্য
সূচনা: ১৯৭৭ সালের দিকে জিয়াউর রহমান এই কর্মসূচির সূচনা করেন
লক্ষ্য: বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা করা এবং কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করা
সাফল্য: এই কর্মসূচির আওতায় ৩,৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়েছিল
বর্তমান উদ্যোগ: ২০২৬ সালে বর্তমান সরকার নতুনভাবে ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে
জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগ সে সময় গ্রামীণ উন্নয়নে সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিলো। ১৯৭৭ সালে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা করা এবং কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করা। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত হওয়ায় এটি একদিকে যেমন গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নের অংশীদার হওয়ার মানসিকতাও গড়ে তুলেছিল। তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩,৬৩৬ মাইল (মতান্তরে ২,২০০ মাইল বা ৩,৫৫০ কিলোমিটার) খাল খনন করা হয়। এর ফলে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই কার্যক্রমটি স্তিমিত হয়ে পড়ে, তবুও গ্রামীণ উন্নয়ন ও জল ব্যবস্থাপনার এই উদ্ভাবনী মডেলটি বর্তমান সময়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই— ৪৫ বছর পরও কেন টিকে থাকার দায়ে একই প্রয়োজন আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে?
খাল খনন: একটি পুরোনো কিন্তু কার্যকর সমাধান
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ডেল্টাভিত্তিক। নদী থেকে শাখা খাল, খাল থেকে বিল- এই জলপ্রবাহের ধারাবাহিকতা একসময় প্রাকৃতিকভাবে বজায় থাকতো। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্ষার পানি ছড়িয়ে পড়তো কৃষিজমিতে, আবার অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরে যেতো নদীতে। কিন্তু গত কয়েক দশকে নগরায়ন, দখল, অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের কারনে এই খালগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ফলে কয়েকটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে, যেমন-
বর্ষায় জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা।
খাল খনন মূলত এই প্রাকৃতিক জলপ্রবাহকেই পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রচেষ্টামাত্র।
কেন খাল গুরুত্বপূর্ণ? এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভ কী?
খাল খননের অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক সময় সরাসরি চোখে পড়ে না, কিন্তু এর প্রভাব গভীর।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি: বাংলাদেশের কৃষি এখনো বড় অংশে সেচনির্ভর। খাল পুনরুদ্ধার হলে কৃষিজমিতে প্রাকৃতিকভাবে পানি পৌঁছাতে পারে, যা সেচ ব্যয় কমায় এবং উৎপাদন বাড়ায়।
মৎস্যসম্পদ পুনরুজ্জীবন: অনেক খালই একসময় স্থানীয় মাছের প্রাকৃতিক আবাস ছিল। খাল পুনরুদ্ধার হলে মৎস্য উৎপাদনও বাড়তে পারে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবহন সুবিধা: বাংলাদেশে নৌপথ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক গ্রামীণ এলাকায় খাল পুনরুজ্জীবিত হলে স্থানীয় নৌযাতায়াত সহজ হতে পারে।
জলাবদ্ধতা কমানো: শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই জলাবদ্ধতা অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করে। খাল থাকলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরে যেতে পারে।
কর্মসংস্থান: খাল খনন প্রকল্প নিজেই একটি শ্রমনির্ভর কার্যক্রম, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেবে।
৪৫ বছর আগে জিয়াউর রহমান কেন শুরু করেছিলেন?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল চরম অর্থনৈতিক সংকটে। শিল্পভিত্তি দুর্বল, অবকাঠামো সীমিত, এবং কৃষিই ছিল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের উন্নয়নদর্শনের একটি বড় অংশ ছিল গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করা।
খাল খনন কর্মসূচীর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ ছিল-
কৃষিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে উন্নয়ন। অর্থাৎ, এটি শুধু পরিবেশগত প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল একটি গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন পরিকল্পনা। কিন্তু ভূপ্রকৃতি কিংবা ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে, এই খাল খনন কর্মসূচী সম্পূর্ণভাবে একটি আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রক্রিয়া হলেও এর প্রভাব ছিল আসলে সুদূরপ্রসারী।
জিয়াউর রহমানের অন্তর্দৃষ্টি সে যাত্রায় বাংলাদেশকে হয়তো এই কর্মসূচীর মাধ্যমেই একশো বছর এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। সোজা কথায়, তাঁর দূরদর্শী লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বনির্ভর করা। পরনির্ভরশীলতায় নূহ্য না হয়ে আত্মনির্ভরতার বলে বলীয়ান হয়ে ওঠা। এক কথায়, মূলত আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে শুরু হওয়া একটি জনসম্পৃক্ত জাতীয় আন্দোলন ছিল এ প্রকল্প। এর সাথে সরাসরি ভারতের কোনো প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা ছিল না, তবে ভৌগোলিকভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা পুনর্ভবা নদীর মতো আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো থেকে আসা বিল লতা খালের মতো খালগুলো এই প্রকল্পের আওতায় পুনর্খনন করা হয়েছিল, যা স্থানীয় সেচ ও কৃষিতে সুবিধা এনেছিলো। ভারতের সঙ্গে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক বা যৌথ প্রকল্প না হলেও, খাল খননের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় কৃষিজমির সেচ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং উৎপাদন বাড়ানো, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। আর তাছাড়া ফারাক্কা বাঁধের মতো অন্যায্য চাপিয়ে দেওয়া ভারতীয় বাঁধ প্রকল্পগুলোর দরুন আমাদের বছর বছর ভোগান্তি তো আছেই।

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান এই কর্মসূচির সূচনা করেন
এটি এমন এক যুগান্তকারী প্রকল্প ছিল, যা কোনো আন্তর্জাতিক সহায়তার বদলে সম্পূর্ণভাবে দেশীয় সম্পদ ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়েছিলো। যা যেকোনো দেশেরই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এক বিরল ঘটনা। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে সৃষ্ট পানিশূন্যতা ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি একটি অত্যন্ত কার্যকরী অভ্যন্তরীণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত। এই কর্মসূচিটি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, যা বর্তমানেও (২০২৬ সালের সাম্প্রতিক উদ্যোগসহ) গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, নদীর নাব্যতা ও পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির মজুদ বাড়িয়ে কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর ছিল এ কর্মসূচী।
বর্তমানে যদি এর পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব আমলে নেয়া হয়, তবে খালের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ সম্পূর্ণরূপে নতুন এক ল্যান্ডস্কেপ দিতে পারে বাংলাদেশকে।
খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি এবং বর্ষা মৌসুমের উদ্বৃত্ত পানি খালগুলোতে ধরে রাখা সম্ভব হয়। এতে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা সেই জমানো পানি ব্যবহার করে সেচ কাজ চালাতে পারে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমায় এবং মরু প্রক্রিয়া রোধে সহায়ক হয়। আর ভারতীয় বাঁধগুলোর কারণে তো তিস্তাই শুকিয়ে চৌচির হয়ে থাকে।
পলি জমার কারণে অনেক খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয় এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। খাল খননের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরে আসে, যা বর্ষায় জলাবদ্ধতা দূর করতে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। খালগুলো পুনঃখননের ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হয়, যা আমিষের চাহিদা মেটাতে এবং মৎস্যজীবীদের উপার্জনে সহায়ক হয়। এছাড়াও খাল খননের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ভূ-উপরিস্থ পানির মজুদ বাড়িয়ে সেচ ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা হবে দারুণ কার্যকরী।
সবকিছু হিসেব করলে মূল পয়েন্ট থাকে চারটা- সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নাব্যতা রক্ষা ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা,কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলোতে নির্মিত বেশ কিছু বাঁধ ও ব্যারেজ শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা এবং বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে সমস্যা সৃষ্টিকারী প্রধান ভারতীয় বাঁধসমূহ
ফারাক্কা বাঁধ (গঙ্গা নদী): পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে অবস্থিত এই বাঁধটি ১৯৭৫ সালে চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ব্যাপক কমিয়ে দিয়েছে, যা উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণ ও লবণাক্ততা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গজলডোবা ব্যারেজ (তিস্তা নদী): পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে অবস্থিত এই ব্যারেজটির মাধ্যমে ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারেজ’ অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীটি মরুভূমিতে পরিণত হয়।
টিপাইমুখ বাঁধ (বরাক নদী- প্রস্তাবিত/নির্মাণাধীন): ভারতের মনিপুরে এই বাঁধটি পুরোপুরি কার্যকর হলে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রবাহ মারাত্মক বিঘ্নিত হবে এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
ডুম্বুর বাঁধ (গোমতী নদী): ত্রিপুরার এই বাঁধের গেট হঠাৎ খুলে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের কুমিল্লা ও ফেনী অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
অন্যান্য: মনু, খোয়াই ও মহানন্দা নদীর ওপর নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামোও স্থানীয়ভাবে পানিশূন্যতা ও আকস্মিক বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ২০২৬ সাল নাগাদ দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের যে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে, তা মূলত এই “পানি আগ্রাসন” মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষারই একটি অংশ বলে ধরে নিতে অবশ্য অত্যুক্তি হবার কথা নয়! আর তাছাড়া কূটনীতির ভাষায়, যেকোনো দেশেরই নিজের ভালোটা বোঝা উচিত। কাউকে বাড়তি সুবিধা দিতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে নিজ দেশের পরিবারগুলোর সর্বস্ব হারানোর কোনো অর্থ হয়না।
উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু ভিত্তি কেন দুর্বল রয়ে গেছে?
গত চার দশকে বাংলাদেশ অনেক উন্নয়ন দেখেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিল্প- অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু একই সময়ে কিছু মৌলিক সমস্যা অমীমাংসিত থেকে গেছে। প্রথমত, উন্নয়নের পরিকল্পনায় অনেক সময় প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নদী ও খালকে অনেক ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা হয়েছে, সম্পদ হিসেবে নয়।
দ্বিতীয়ত, অপরিকল্পিত নগরায়ন। শহর ও শহরতলিতে অসংখ্য খাল দখল হয়ে গেছে।
তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার ও ভূমি প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অনেক সময় দুর্বল রয়ে গেছে। ফলে উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের ভিত্তি- প্রাকৃতিক জলব্যবস্থা- ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কেন আবার পুরোনো প্রযুক্তির কাছে ফিরে যেতে হচ্ছে
খাল খনন কোনো আধুনিক প্রযুক্তি নয়। এটি বহু পুরোনো একটি পদ্ধতি। কিন্তু অনেক সময় পুরোনো পদ্ধতিই সবচেয়ে কার্যকর হয়, বিশেষ করে যখন সেটি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আধুনিক উন্নয়ন অনেক সময় বড় অবকাঠামো নির্মাণের দিকে ঝুঁকে পড়ে- ড্রেনেজ পাম্প, কংক্রিটের নালা, বিশাল বাঁধ। কিন্তু এসব ব্যবস্থা সবসময় টেকসই হয় না। অন্যদিকে খাল পুনরুদ্ধার প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে কাজে লাগায়। তাই এটি কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে। এ কারনেই আজ বিশ্বের অনেক দেশ আবার প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের দিকে ফিরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও খাল খনন সেই ধারণারই একটি বাস্তব রূপ। তবে এর সঙ্গে ভূ-সামরিক কৌশলেরও যোগসূত্র থাকতে পারে এমন ধারণাও উড়িয়ে দেবার মতো নয়।
৪৫ বছরের ব্যবধান: একটি প্রতীকী প্রশ্ন
আজ যখন আবার খাল খননের কথা ওঠে, তখন এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়- এটি একটি প্রতীকী প্রশ্নও। কেন আমরা এমন এক দেশে বাস করছি যেখানে পানির দেশ হয়েও পানি ব্যবস্থাপনা একটি বড় সংকট?
কেন এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ- যা একসময় আমাদের অর্থনীতি ও পরিবেশকে টিকিয়ে রেখেছে- ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে? আর কেন ৪৫ বছর পরে আবার সেই পথেই ফিরতে হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো সহজ নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—টেকসই উন্নয়ন শুধু বড় অবকাঠামো দিয়ে হয় না; তার জন্য প্রয়োজন প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন শুধু শিল্পায়ন বা নগরায়নের ওপর নির্ভর করবে না। এটি নির্ভর করবে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করতে পারি তার ওপর।
খাল খনন কর্মসূচী তাই কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি এক ধরনের স্মরণও— এই দেশের উন্নয়নের ভিত্তি লুকিয়ে আছে তার নদী, খাল আর পানির প্রবাহে।
৪৫ বছর আগে যে চিন্তা থেকে একটি ক্যাম্পেইনের শুরু সেই সুবোধ আবার ফিরে এসেছে। প্রশ্ন এখন শুধু একটি- এইবার কি আমরা সেই শিক্ষা থেকে সত্যিই কিছু শিখতে পারবো?











































