
এই অভিশাপের নাম আরবি ভাষায় ‘লা’নাতুল আকদ আস্-সামিন’, অর্থাৎ অষ্টম দশকের অভিশাপ
রাতের আকাশে নীল-সাদা পতাকা দুলছে। স্বাধীনতার গান শোনাচ্ছে ইতিহাসের কণ্ঠ। উৎসবের মধ্যে ঘুরছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সেই আতঙ্কের নাম— ৮০। আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র যখন অষ্টম দশকের শেষের দিকে এসে দাঁড়াচ্ছে, তখন রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কথোপকথনে বারবার শোনা যাচ্ছে এক বাক্য, ‘কোনো ইহুদি রাষ্ট্র ৮০ বছরের বেশি টেকে না।’ এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এক বিশেষ শব্দবন্ধ, যা বলে দেয় যে এই দশকের শেষ প্রান্তে রাষ্ট্রটি কোনো অদৃশ্য অভিশাপে বন্দী।
এই অভিশাপের নাম আরবি ভাষায় ‘লা’নাতুল আকদ আস্-সামিন’, অর্থাৎ অষ্টম দশকের অভিশাপ। ইংরেজিতে বলা হয় ‘কার্স অব দ্য এইটথ ডিকেড’। মনে হয় যেন রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে একটি গোপন টাইমারও সেট করা হয়েছিল। সময় এগোচ্ছে, ধূসর ছায়ার মতো, আর সেই ছায়া ক্রমে রাষ্ট্রের প্রান্তে ভেসে আসছে। কিন্তু সত্য কি সত্যিই এমন?

ধর্মীয় সূত্রে তাকালে দেখা যায়, ইহুদি ধর্মগ্রন্থগুলোতে কোনো রূপক বা নির্দেশ নেই, যা আধুনিক রাষ্ট্রের আয়ু নির্ধারণ করে। ব্যাবিলনীয় তালমুদ এবং জেরুজালেমের তালমুদ—এই দুই বিশাল গ্রন্থে ধর্মীয় আইন, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ এবং তোরাহর ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সীমা বা সংবিধান নিয়ে কোনো কথা নেই। এগুলো সংকলিত হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে এমন এক সময়ে, যখন রাষ্ট্রের ধারণাই ছিল না। তখনকার পাঠকে আধুনিক বাস্তবতায় প্রয়োগ করলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। তবুও ইতিহাস ও ধর্মের কিছু আয়াতকে সংযোগের চেষ্টা করা হয়। বাইবেলের গীতসংহিতায় মানুষের গড় আয়ু ৭০ থেকে ৮০ বছর উল্লেখ আছে। কিছু ব্যাখ্যাকারী সেই সংখ্যা রাষ্ট্রের জীবনচক্রের সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু এটি কেবল রূপক। ধর্মীয় বিধান নয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘৮০ বছরের নিয়ম’ কোনো স্থির সূত্র নয়। প্রাচীন ইহুদি শাসনব্যবস্থার কিছু অধ্যায় স্বল্পস্থায়ী ছিল, যেগুলোর আয়ু প্রায় আট দশকের কাছাকাছি। এই উদাহরণগুলো থেকেই ধারণাটি শক্তি পায়। কিন্তু একই ইতিহাসে আমরা দেখি কিংডম অব জুডাহ কয়েক শতাব্দী টিকে ছিল, যতক্ষণ না ব্যাবিলনীয় আক্রমণে পতন ঘটে। আবার সেকন্ড টেম্পল প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে জেরুজালেমে দাঁড়িয়ে ছিল, যতক্ষণ না রোমান সাম্রাজ্য সেটি ধ্বংস করে। অর্থাৎ ইতিহাসের পূর্ণচিত্র এই অভিশাপের ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।

তবে একেবারে উড়িয়েও দেয় না। কারণ, এই রাজত্ব বা স্থাপনা আজকের ইসরায়েলে ছিলো না, বরং ছিলো সেখান থেকে আরো দূরে দক্ষিণে। আজকের ইসরায়েলের যে ভূমি এতে রাজা ডেভিড তথা হযরত দাউদ (আ) এর রাজত্ব ও হাসমোনিয়ান রাজত্বের বাইরে বনী ঈসরাইল থেকে শুরু করে আর কোনো ইহুদি বসতিই রাজ্য হিসেবে ৮০ বছরের বেশি টেকেনি। এ কারণে ইসরায়েলের শাসকগোষ্ঠীর মনে ভয় আছে।
এই ভয়ের শক্তি কোথা থেকে আসে তা বোঝার জন্য আধুনিক ইসরায়েলের জন্মকাল ফিরে দেখতে হয়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা হওয়ার পরপরই রাষ্ট্রটি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। চারপাশে শত্রু রাষ্ট্র। শহরে রকেটের আতঙ্ক। সীমান্তে সেনা মোতায়েন। প্রতিটি প্রজন্মই বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মধ্যে বেড়ে ওঠে। প্রতিটি শহর প্রতিদিন সাইরেনের আওয়াজে জেগে ওঠে। নিরাপত্তাহীনতার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা জাতীয় মনস্তত্ত্বে গভীর ছাপ ফেলেছে। এই দীর্ঘ উৎকণ্ঠার প্রেক্ষাপটে যখন রাষ্ট্র অষ্টম দশকে পৌঁছায়, তখন একটি সংখ্যা সহজেই আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। ৮০ কেবল বছর নয়। এটি একটি মানসিক পরীক্ষা, একটি গল্প, যা মানুষকে সতর্ক করে।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এই ভয়ের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিচারব্যবস্থা সংস্কারের জন্য টানাপোড়েন। ধর্মনিরপেক্ষ এবং অতিধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব। শহরের রাস্তায় লাখো মানুষ বিক্ষোভ করছে। সামাজিক বিভাজন। মতের সংঘাত। এই বিভাজনকে অনেকেই মনে করেন অভিশাপের চিহ্ন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক সতর্ক করেছিলেন, ইতিহাসে ইহুদি সার্বভৌমত্ব বহুবার ভেঙেছে ভেতরের দ্বন্দ্বের কারণে, বাইরের আক্রমণের কারণে নয়। এই সতর্কবাণীই আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’-এর রাজনৈতিক রূপ হিসেবে ধরা হয়।
ভূরাজনীতিকেও কম ভয়ঙ্কর করে তোলেনি ইসরায়েল। তাদের আক্রমণে গাজা উপত্যকা জ্বলছে। পশ্চিম তীর অস্থির। লেবাননের সীমান্ত উত্তেজনায়। ইরানের ছায়াযুদ্ধ। সর্বশেষ ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের আক্রমণ এবং খামেনিকে হত্যা। প্রতিটি সংঘাত রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয়, অস্তিত্ব এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে একটি সংখ্যা সহজেই ভয়কে তীব্র করে তোলে। ২০২৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েলের ৮০ বছর পূর্তি হবে। হাতে সময় আছে আর দুই বছর দুই মাস। এর ভেতরই কি ইসরায়েল পতন দেখবে?
তবে শক্তির উৎসও আছে। প্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক সাফল্য। সাইবার নিরাপত্তা। কৃষি প্রযুক্তি। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কিছু আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ। রাষ্ট্রটি দুর্বল নয়। বরং জটিল। শক্তি ও দুর্বলতার এই ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে বাস্তব ভবিষ্যৎ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দেখা যায়, বিপ্লবী রাষ্ট্র প্রায় তিন প্রজন্মের মধ্যে বড় রূপান্তরের মুখোমুখি হয়। প্রথম প্রজন্ম লড়াই করে। স্বাধীনতা রক্ষা করে। দ্বিতীয় প্রজন্ম প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। তৃতীয় প্রজন্ম প্রশ্ন তোলে। পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা চায়। এই প্রজন্মচক্র ৭০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ঘুরে আসে। তাই অষ্টম দশক একটি সংকট ও রূপান্তরের সময়। পতনের নয়। পুনর্গঠনের সময়। আরব বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও ‘লা’নাতুল আকদ আস্-সামিন’ রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি চাপ, একটি সতর্কবার্তা। একদম সুস্পষ্ট ধর্মীয় বিধান নয়।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বিষয়টা জটিল। তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি উদ্ভাবন—এসব দেশে বৈশ্বিক অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চাপ তৈরি করছে। ইতিহাস দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক শক্তি সামাজিক ঐক্যের সঙ্গে মিলতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। সেই দুর্বলতা আবার ভয়ে রূপান্তরিত হয়। সংখ্যা তখন প্রতীক। মানুষ তখন গল্প খোঁজে। গল্পে ভয় খোঁজে। ভয় তাদের সতর্ক রাখে।
সবশেষে আসল প্রশ্ন সংখ্যা নয়, কাঠামো। রাষ্ট্র ভাঙে তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা হারায়, সামাজিক চুক্তি দুর্বল হয় এবং অভ্যন্তরীণ ফাটল বাইরের চাপের সঙ্গে মিলে যায়। রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন বিভাজনকে সমাধান করা যায়। সমঝোতা, আস্থা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য—এই তিন স্তম্ভই আসল শক্তি। ৮০ কোনো জাদুকরী সীমা নয়। এটি একটি আয়না। রাষ্ট্র সেখানে নিজেকে দেখে। ইতিহাস সিদ্ধান্ত নেবে, সংখ্যা নয়। তাই ৮০ ছুঁলেই পতন—এটি গল্প। তবে ৮০ ছুঁলে পরীক্ষা—এটি বাস্তব।
অষ্টম দশকের অভিশাপ কেবল একটি শব্দ নয়। এটি ভেতরের মানসিক চাপ, ভেতরের বিভাজন, ভেতরের শক্তি। কাউন্টডাউন চলছে। অদৃশ্য। কিন্তু ইসরায়েলের আচরণই নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ। সংখ্যা নয়।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প











































