রবিবার । মে ৩, ২০২৬
এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক বিনোদন ৩ মে ২০২৬, ৩:২২ অপরাহ্ন
শেয়ার

কে-পপ কী তার ‘কোরিয়ান’ পরিচয় হারাচ্ছে!


 

K Pop

এখনকার প্রজন্ম আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে—এমনকি প্রশ্ন উঠছে, ‘কে-পপ কি আদৌ কোরিয়ান থাকা জরুরি?

ঝলমলে আলো, তীব্র বেজ আর উচ্ছ্বসিত দর্শক—দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক গিয়ংবোকগুং প্যালেস পটভূমিতে মঞ্চে হাজির হলেন সাতজন তারকা। এটি ছিল বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটিএস-এর প্রত্যাবর্তন কনসার্ট।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে অংশ নেওয়ার কারণে প্রায় চার বছর বিরতির পর মার্চে তাদের এই প্রত্যাবর্তন কে-পপ ইন্ডাস্ট্রির সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—এখন সামনে কী?

২০১৩ সালে বিটিএস যখন যাত্রা শুরু করে, তখনকার কে-পপ আর আজকের কে-পপ একেবারেই আলাদা। আগে এটি ছিল সীমিত জনপ্রিয় একটি ধারা, আর এখন এটি বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ডলারের শিল্প—গ্র্যামি জয় করছে, দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সফট পাওয়ার’ বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন কে-পপ তার ‘পঞ্চম প্রজন্মে’ প্রবেশ করেছে। এর আগে— দ্বিতীয় প্রজন্মে (২০০০-এর শুরু) কে-পপ ছড়িয়ে পড়ে চীন, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তৃতীয় প্রজন্মে ব্ল্যাক পিংক ও বিটিএস পশ্চিমা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পায়।

এখনকার প্রজন্ম আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে—এমনকি প্রশ্ন উঠছে, ‘কে-পপ কি আদৌ কোরিয়ান থাকা জরুরি?’

উদাহরণ হিসেবে ব্ল্যাক পিংকের নতুন অ্যালবাম ‘ডেডলাইন’-এর বেশিরভাগ গানই ইংরেজিতে। শুধু তাই নয়, এখন বিভিন্ন দেশে নতুন কে-পপ ধাঁচের গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, যাদের সদস্যদের অনেকেরই কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই।

গান লেখক ড্যানি চুং-এর মতে, কে-পপ সবসময়ই পরিবর্তনশীল এবং ক্রমশ আরও ‘গ্লোবাল’ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কে-পপ শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশক থেকেই শিল্পীরা জাপান ও চীনে নিজেদের ভক্তগোষ্ঠী তৈরি করতে শুরু করেন। এমনকি প্রাথমিক গ্রুপগুলোর নাম (যেমন H.O.T., S.E.S.) ইংরেজিভাষীদের সহজে উচ্চারণযোগ্য করে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে শিল্পীদের বিভিন্ন ভাষা শেখানো এবং বিভিন্ন দেশের সদস্য যুক্ত করার প্রবণতাও বাড়ে।

আজকের দিনে কে-পপ অনেকটাই ‘মিশ্র সংস্কৃতি’—গান লেখক, কোরিওগ্রাফার, প্রযোজক—অনেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে আসছেন।

bts

বিটিএস

‘কে-পপ পদ্ধতি’ কী?
এই নতুন মডেলের একটি আলোচিত উদাহরণ হলো Katseye—লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একটি গ্রুপ, যার পেছনে রয়েছে HYBE (যারা BTS তৈরি করেছে)।

এই গ্রুপটি ইংরেজিতে গান গায় এবং বিভিন্ন দেশের সদস্য নিয়ে গঠিত। তবে তাদের তৈরি করা হয়েছে কে-পপের পরিচিত কঠোর প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে এ নিয়ে ভক্তদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে—এটি কি সত্যিই কে-পপ?

অনেকে বলছেন, কে-পপের আসল পরিচয় ভাষা বা জাতিগত নয়, বরং এর বিশেষ প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, ভিজ্যুয়াল স্টাইল, এবং ভক্তদের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরির কৌশল।

এই ‘কে-পপ সিস্টেম’ নিয়ে তাই সমালোচনাও কম নয়। শিল্পীদের ওপর কঠোর নিয়ম, মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কাজের চাপ—এসব নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবুও অনেকেই মনে করেন, এই কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতিই কে-পপকে আলাদা করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কে-পপে কিছু পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হবে— সংগীতে ‘হাইপারপপ’ ধাঁচের দ্রুত বিট ও ছোট, ভাইরাল অংশ বাড়বে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য সহজে শেয়ারযোগ্য কনটেন্ট তৈরি হবে। প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।

তবে বিটিএস-এর মতো সাফল্য পুনরাবৃত্তি করা সহজ হবে না। তাদের উত্থান সামাজিক মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার এবং মহামারির সময়ের অনলাইন বিস্তারের কারণে বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল।

blackpink

ব্ল্যাকপিংক

অর্থনৈতিক দিক
কে-পপ এখনো অত্যন্ত লাভজনক শিল্প। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বড় চারটি কে-পপ কোম্পানির (যেমন HYBE) সম্মিলিত আয় প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

এছাড়া বড় কোম্পানিগুলো একসঙ্গে “Fanomenon” নামে একটি বড় আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে, যাকে অনেকেই “K-chella” বলছেন—Coachella-এর অনুকরণে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কে-পপ যদি তার ‘কোরিয়ান’ পরিচয় হারায়, তাহলে কি ভক্তরা আগের মতো থাকবে? অনেক ভক্ত, বিশেষ করে প্রবাসী এশীয়রা, কে-পপে কোরিয়ান পরিচয়টিকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন। এটি শুধু সংগীত নয়, বরং একটি সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ।

কে-পপের জনপ্রিয়তা মূলত ‘হাল্লিউ’ বা Hallyu-এর অংশ—যার মাধ্যমে কোরিয়ান ড্রামা, সৌন্দর্যপণ্য এবং খাবারও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা যদিও মনে করেন, কে-পপ একটি ‘নিরন্তর পরিবর্তনশীল’ শিল্প। এটি সময়ের সঙ্গে বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। কারণ পরিবর্তনকে থামানো যায় না। বরং এই পরিবর্তনই কে-পপকে আরও বিশ্বব্যাপী সহজলভ্য করে তুলছে।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প