সোমবার । মে ১১, ২০২৬
টনি উইলসন ডি’কস্তা মতামত ১১ মে ২০২৬, ৩:৫৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

মোবাইল ফোন বনাম শিশুর অসহায় অভিভাবক


Tony Kosta
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম যেটা খুঁজি সেটা যেমন মোবাইল আবার ঘুমাতে বিছানায় যাবার পর সবশেষে যার সাথে আমাদের দেখা হয় সেটাও মোবাইল। না খেয়ে থাকা সম্ভব কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিন না দেখে খুব কম সময়ই থাকা সম্ভব। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জন্যই মোবাইল একটি ভ্যাকসিন অথবা একটি ঔষধ অথবা একটি মাদকে পরিণত হয়েছে। মন ভালো থাকলেও মোবাইল, মন খারাপ থাকলেও মোবাইল। সুখের সময়ও মোবাইল আবার দুঃখের দিনেও মোবাইল। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় মোবাইল আমাকে চালায় নাকি আমি মোবাইল চালাই!

এখন আসা যাক আমাদের সন্তানদের কথায়। শিশুরা, বিশেষত তিন থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোবাইল আসক্তি পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের জন্য একটি ভীষণ চিন্তার বিষয়। মোবাইল ব্যবহারের সুফল ও কুফল সম্পর্কে আমরা এখন অনেক কিছুই জানি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি কেন অল্প বয়সেই শিশুরা মোবাইলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে! আর কিভাবেইবা আমরা পিতা-মাতা বা অভিভাবকরা মোবাইল আসক্তি থেকে নিজেদের সন্তানদের মুক্ত রাখতে পারবো। নিজের সন্তানকে যত্ম নিতে গিয়ে কিছু বিষয় আমি উপলব্ধি করেছি এবং কিছু কৌশলও অবলম্বন করেছি যা অনেকের ক্ষেত্রে কার্যকর হতেও পারে।

১. শিশু জেগে থাকা অবস্থায় তার সামনে মোবাইল ব্যবহারে সতর্ক থাকা। খেয়াল করে দেখেছি যখন সন্তানের উপস্থিতিতে আমি মোবাইলে মনোযোগ দেই তখন সেও আমার পাশে আসে এবং দেখে আমি কী করছি! কী আছে এই যন্ত্রটার মধ্যে! কৌতুহল তৈরি হয়। পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যরাও যখন কেউ মোবাইল হাতে নেয় তখন আমার সন্তান তা পর্যবেক্ষণ করে। যখন বিষয়টি আমার নজরে আসে তখন উপলব্ধি করলাম শিশুদের মোবাইলে আসক্তির সূত্রপাত হয় এভাবেই। এখন ভাবতে শুরু করলাম সমাধান কী হবে! আমাদের তো মোবাইল ব্যবহার প্রয়োজন! অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, সন্তান জেগে থাকা অবস্থায় আমরা মোবাইলে ফোন রিসিভ করা আর জরুরি ফোন করা ব্যতীত নিজেদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবো। সন্তান যখন ঘুমাবে তখন ব্যক্তিগত কাজে মোবাইল ব্যবহার করবো। ফোন রেখে দেওয়া শুরু করলাম ফ্রীজের উপর। মোবাইল সামনেও নাই তাই ফোনের চিন্তাও নাই। নিজেদের ত্যাগ স্বীকার করতে হলো কিন্তু সমাধান একটা পাওয়া গেল।

২. এই বয়সী শিশুরা সারাদিন খেলতে চায়, আর সারাদিন জিনিসপত্র, খেলনা সারা ঘর ছড়িয়ে বেড়ায় কিন্তু গুছিয়ে রাখে না। অনেক পিতা-মাতা ও অভিভাবক বিরক্ত বোধ করে এবং মোবাইল হাতে ধরিয়ে দেয় কারণ এর চেয়ে সহজ সমাধান আর নেই এবং শিশুকে আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। ভয়ানক বিষয় হলো এই যে, পরে দোষ দেয় সন্তানের উপর বা অন্য কারও উপর। সন্তানের সাথে আনন্দ নিয়ে খেলতে হবে, যতবার অগোছালো করবে ততবার গুছিয়ে রাখতে হবে। পিতা-মাতার ধৈর্য্য এবং শিশুদের সাথে সময় দেয়াই পারে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে। যথাসম্ভব বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন প্রকারের খেলনা, ব্লক, পাজল, হাতে তৈরি বিভিন্ন খেলনা শিশুদের দেওয়া জরুরি। তাদেরকে খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখতে পারলে পিতা-মাতার পক্ষে সম্ভব মোবাইল হতে শিশুকে দূরে রাখা।

৩. প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাবার আসলে কোন সুযোগ নেই। বরং কীভাবে কৌশল অবলম্বন করে প্রযুক্তিকে শিশুদের শেখানোর জন্য ব্যবহার করা যাবে তা আমাদের ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে। শিশুদের শিক্ষাদানে ডিজিটাল পদ্ধতি ও মাধ্যমগুলোর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশুদের উপযোগী অনেক কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা হর-হামেশাই পাওয়া যাচ্ছে। শিশুরা আজকাল স্মার্ট টেলিভিশন-এ ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে অনেক উপযোগী ভিডিওচিত্র দেখানো হচ্ছে ফলে অনেক বিষয়ে শিশুদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে। পাশাপাশি কম্পিউটার এর ব্যবহারও দিন দিন শিক্ষাক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা যখন বাসায় অফিসের কাজ করতে ল্যাপটপ খুলছি তখন শিশু আকৃষ্ট হচ্ছে। তাই প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহার করে কীভাবে শিশুর বিকাশে ভূমিকা রাখা যাবে তা ভেবে দেখার সময় এখন। আমরা কি আবারও সহজ সমাধানের দিকে যাবো! নাকি শৃঙ্খলার মধ্যে শিশুদের রাখতে সচেষ্ট হবো! সারাদিন টেলিভিশন দেখতে দেওয়া অবশ্যই কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। তাই সময় নির্ধারণ করে যত অল্প সময় দেওয়া যায় ততই ভালো। শিশুকে যদি সারাদিন অন্যান্য কাজে ব্যস্ত রাখতে পারি তাহলে আর টেলিভিশন দেখার প্রশ্নই আসবে না।

৪. মোবাইল আসক্তি’র কারণে বই পড়ার অভ্যাস অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। বই আমরা পড়ি মোবাইল স্ক্রিনে। আমাদের সন্তানদের যদি বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হয় তবে তা ছোট বয়সেই করতে হবে। অনেক রঙিন বই শিশুদের হাতে তুলে দিতে হবে। তাদের সাথে বই নিয়ে সাথে বসতে হবে। বই পড়ে শোনাতে হবে। এই কাজগুলো অনেক কষ্টের মনে হয় অনেক পিতা-মাতা’র কাছে। তাই সহজ সমাধানের পথ বেছে নেয়। একবার ট্রেনে যাত্রাকালে একটা শিশুতোষ রঙিন বই কিনে তা নিয়ে সময় কাটাতে কাটাতে গন্তব্যস্থলে পৌছে গিয়েছিলাম। বাসায় শিশুর জন্য বই রাখার স্থান রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে বই নিয়ে তাদের সাথে সময় কাটানো অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

৫. শিশুরা রং পছন্দ করে, লিখতে ও আঁকতে পছন্দ করে। তাই শিশুদের লেখা ও আঁকিবুকি’র জন্য সুযোগ তৈরি করা একান্ত দরকার। শিশুকে বোর্ড, খাতা, রং পেন্সিল ইত্যাদি উপকরণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। উপকরণগুলো পেলে শিশু ব্যস্ত থাকবে পাশাপাশি সৃজনশীলতা, লেখা ও আঁকার দক্ষতা বাড়বে। আপনার কাছে যেটা বর্ণ সেটা শিশুর কাছে একটি চিহ্ন মাত্র। সে জানে না বর্ণ কী কাজে লাগবে, সে শুধুমাত্র খেলার ছলেই সেগুলো লিখবে, রং চিনবে এবং বিভিন্ন কিছু আঁকতে চেষ্টা করবে যেগুলো প্রতিনিয়ত সে দেখে।

৬. ইদানিং একটা বিষয় খুব বেশি দেখা যায় যে খাবার সময় শিশুর মোবাইল লাগবে। পিতা-মাতা ও অভিভাবকের জন্য খুবই কষ্টকর হয় সন্তানকে খাওয়ানো। কোন উপায়ন্তর না দেখে শেষে সহজ পদ্ধতি বেছে নেয়। শিশুরা কি খাচ্ছে তার স্বাদ কি কিছুই খেয়াল করেনা, শুধু মুখ দিয়ে খেয়েই যায়। তবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পরিবারে সবাই মিলে একসাথে খাবার অভ্যাস ও নিজে তুলে খাবার অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। কি রান্না হয়েছে, কোন খাবারের স্বাদ কেমন ইত্যাদি জিজ্ঞেস করা, আলাপ করার মাধ্যমে শিশুদের আগ্রহ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিশুরা অনেক সময় অন্য শিশুদের সাথে যখন থাকে তখন খাবার প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

৭. দিনদিন শিশুরা ঘরকুনো হয়ে পড়ছে। বাইরে খেলতে যাওয়া, দৌড়াদৌড়ি করা, নিয়ম মাফিক বাইরে হাটতে যাওয়া ও আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদির দিকে অনেক সময় নজর দেয়া হচ্ছে না। নিয়ম করে প্রতিদিন শিশুদের সাথে বাইরে গেলে, তাদের বাহিরে খেলার সুযোগ তৈরি করলে বিশেষত অন্য শিশুদের সাথে খেলার সুযোগ করলে, বিভিন্ন কিছুর সাথে তাদের পরিচয় করাতে পারলে শিশুরা পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে পারবে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বিশেষত শহর এলাকায় খেলার মাঠের সংকট প্রকট! তারপরও শহর অথবা গ্রাম যেখানেই হোক না কেন সুযোগগুলো খুজে নিতে হবে। বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সাথে নিয়ে যাওয়া। ধর্মীয় চর্চা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে শিশুদের যুক্ত রাখার মাধমে আমরা শিশুকে আরও বেশি সামাজিক করে গড়ে তুলতে পারি।

আপনার ২৪ ঘণ্টা আপনি না হয় অফিস করেন, ঘরের কাজ করেন, বাজার করেন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন কিন্তু আপনার শিশু যার তেমন কোন কাজকর্ম নেই সে কীভাবে তার ২৪ ঘণ্টা পার করবে সেটা কি কখনো ভেবেছেন? সে তো আপনার-আমার উপর নির্ভরশীল তাই শিশুর ২৪ ঘন্টা কীভাবে অর্থপূর্ণভাবে কাটবে তা আপনাকে-আমাকে ভাবতে হবে এবং তাদের জন্য রুটিন তৈরি করা প্রয়োজন।

৩-৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য একটি দৈনন্দিন রুটিনে কোন কোন বিষয়গুলো রাখা যেতে পারে।
• শারীরিক খেলা ও ব্যায়াম: দৌঁড়াদৌড়ি, লাফানো, ট্রাইসাইকেল চালানো বা বল খেলা তাদের পেশির বিকাশে সাহায্য করে।
• সৃজনশীল কাজ: ছবি আঁকা, রং করা, ক্লে দিয়ে মডেল তৈরি বা ব্লক দিয়ে ঘর বানানো।
• কল্পনার খেলা: পুতুল নিয়ে খেলা, ডাক্তার খেলা বা বিভিন্ন চরিত্রের সাথে পরিচিতি।
• জ্ঞানমূলক শেখা: বর্ণমালা, সংখ্যা, ছড়া এবং ছোট গল্প শোনা বা পড়া।
• সামাজিক দক্ষতা: সমবয়সীদের সাথে মিলেমিশে খেলা, খেলনা শেয়ার করা এবং সামাজিক আদব-কায়দা শেখা।
• দৈনন্দিন কাজ: নিজে খাওয়া, পোশাক পরা, হাত ধোয়া এবং খেলনা গুছিয়ে রাখা।
• পর্যাপ্ত বিশ্রাম: প্রতিদিন ১০-১৩ ঘণ্টা ঘুমের ব্যবস্থা সাথে দুপুরের একটি ছোট ঘুম।
• পুষ্টিকর খাবার: সময়মতো ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার, ফল-মূল, শাক-সবজি, মাছ, ডিম, খিচুড়ি, দুধ ইত্যাদি খেতে দেওয়া এবং বাহিরের অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করা।

পিতা-মাতা বা অভিভাবক হিসাবে শিশুকে সময় দেওয়া, কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করা, ধৈর্য্য ধারণ করা, শাস্তি নয় বরং শৃঙ্খলার চর্চা, নিজেদের মধ্যে বোঝাাপড়া ও সকলে মিলেই শিশুর গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ বয়সে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কথায় আছে ‘অতি আদরে বাদর’ অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই আমরা শিশুদের সব চাহিদাকে পূরণ, শৃঙ্খলা না শেখানো, কষ্ট বুঝতে না দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে আলাদা জগতে তাদের নিয়ে যাই, যা শিশুর সার্বিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সর্বোপরি মনে রাখা দরকার, সবার জন্য একই সূত্র প্রযোজ্য নাও হতে পারে। নিজের সন্তানের জন্য উপযোগী সূত্র নিজেকেই আবিষ্কার করতে হবে। সূত্র আবিষ্কার করার জন্য নিউটন বা আইনষ্টাইন হওয়ার দরকার নেই, শুধু প্রয়োজন শিশুর প্রতি সচেতনভাবে নজর রাখা এবং অবস্থা বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া।

টনি উইলসন ডি’কস্তা: টেকনিক্যাল এডুকেশন স্পেশালিস্ট, ওয়ার্ডভিশন বাংলাদেশ

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল