শুক্রবার । জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালাম মতামত ৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৪:৩০ অপরাহ্ন
শেয়ার

বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা ও একটি শ্রেণিকক্ষের গল্প


Kamruzzaman Kalam

সকাল সাড়ে আটটা। গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘণ্টা পড়েছে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষক রেহানা বেগম খাতায় চোখ বুলিয়ে নিলেন- আজ বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলা বিষয়ে নতুন পাঠ শুরু করার কথা। কিন্তু বেঞ্চে বসা শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়েই তিনি বুঝে গেলেন, পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মাঝখানে ফারাকটা কতটা গভীর।

পেছনের বেঞ্চে বসা রাশেদ এখনো ঠিকমতো পড়তেই পারে না। সামনের সারিতে থাকা মুনিয়া আবার গল্পের বই পড়ে ফেলে। একই শ্রেণি, একই সময়- কিন্তু শেখার স্তর ভিন্ন। তবু রেহানাকে এগোতেই হবে- কারণ পাঠ-পরিকল্পনায় আজকের পাঠ আজই শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।

এই চিত্রটি কোনো একটি বিদ্যালয়ের নয়। বাংলাদেশের হাজারো প্রাথমিক শিক্ষকের প্রতিদিনের বাস্তবতা এটি। বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা তাদের হাতে একটি পথনির্দেশনা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই পথ অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে খাপ খায় না।

নীতিগতভাবে বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এতে শ্রেণি ও বিষয়ভিত্তিক পাঠ বিভাজন, সময় বণ্টন, মূল্যায়নের নির্দেশনা- সবই থাকে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়েন- পাঠ-পরিকল্পনা মেনে চলবেন, নাকি শিক্ষার্থীর শেখার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবেন!

রেহানা বেগমের মতো অনেক শিক্ষকই শেষ পর্যন্ত নিজের বিবেককে অনুসরণ করেন। তিনি আজ নতুন পাঠ শুরু না করে আগের পাঠটাই আবার বোঝানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে রাশেদের মতো শিক্ষার্থীরা উপকৃত হলো। কিন্তু তার মনে এক ধরনের অস্বস্তি থেকে গেলো- “আমি কি নিয়ম ভাঙছি?”

এই অপরাধবোধ বা মানসিক চাপই বর্তমান ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট। শিক্ষক যদি প্রতিনিয়ত ভাবেন- তিনি ঠিক কাজটি করছেন, নাকি নির্দেশনা অমান্য করছেন বা নিয়ম ভাঙছেন- তবে সৃজনশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদান সম্ভব হয় না।

আরেকটি বাস্তবতা হলো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। অনেক শিক্ষকই বলেন, প্রশিক্ষণে তারা শেখেন কোন সপ্তাহে কোন পাঠ পড়াতে হবে, কিন্তু শেখেন না- শ্রেণিকক্ষে যদি অর্ধেক শিক্ষার্থী না বোঝে, তখন কী করবেন। ফলে বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা অনেক সময় সহায়ক দলিল নয়, বরং চাপের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

তাহলে সমাধান কোথায়?
প্রথমত, শিক্ষককে বিশ্বাস করতে হবে। পাঠ-পরিকল্পনা হবে সহায়ক মানচিত্র, কঠোর নিয়মপুস্তক নয়। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর প্রয়োজনে সাময়িক পরিবর্তন আনেন, সেটিকে ব্যর্থতা নয়, পেশাগত দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনায় শিখনস্তরভিত্তিক বিকল্প পথ থাকা জরুরি- যাতে রাশেদ ও মুনিয়া দুজনেই নিজের জায়গা থেকে এগোতে পারে।

তৃতীয়ত, একাডেমিক তদারকি হতে হবে সহায়তামূলক। পরিদর্শনের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- “শিশুরা শিখছে কি না, শিশুরা কী শিখছে, কতটা শিখছে”- কেবল “সিলেবাস কতটুকু শেষ হলো” তা নয়।

দিনের শেষে রেহানা বেগম যখন খাতা বন্ধ করেন, তিনি জানেন- সব পাঠ শেষ হয়নি, কিন্তু আজ অন্তত কয়েকটি শিশু নতুন করে পড়া বুঝতে পেরেছে। যদি বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়, তবেই প্রাথমিক শিক্ষা সত্যিকার অর্থে শিশুবান্ধব হবে।

পরিকল্পনা নয়, শেখাই হওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষার আসল মানদণ্ড।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালাম: এডুকেশন লিড, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।