
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পালাবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবারই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—ক্ষমতার পরিবর্তন কি শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও রূপান্তর? সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—‘দখল সংস্কৃতি’। এটি শুধু রাজনৈতিক দলের ভেতরের বিষয় নয়; বরং প্রশাসন, ব্যবসা, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান, এমনকি সামাজিক কাঠামোর গভীরেও এর প্রভাব পড়ছে।
এই দখল সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে ক্রিকেট বোর্ডের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে অনেকে দেখছেন। সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি প্রতীকী ঘটনা—যেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘদিনের অবদান নয়, বরং ক্ষমতার নৈকট্যই হয়ে উঠছে প্রধান মাপকাঠি। ফলে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানও রাজনৈতিক প্রভাবের দখলদারিত্বের আলোচনায় চলে এসেছে। এটি শুধু একটি বোর্ডের বিষয় নয়; এটি বৃহত্তর একটি প্রবণতার প্রতিফলন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়—যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংগ্রামে ছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, তাদের তুলনায় আজ বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে এক নতুন গোষ্ঠীকে। তারা ‘অরাজনৈতিক সুবিধাভোগী’—যাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা ত্যাগের ইতিহাস নেই, কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মাঠে নেমেছে।
এই গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, তারা অত্যন্ত দ্রুত অভিযোজিত। যে ক্ষমতা আসে, তারা তার সঙ্গেই নিজেদের যুক্ত করে ফেলে। গত শতকে কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশ-বিদেশে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে, এমনকি পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবসায়িক বা সামাজিক সম্পর্ক বজায় রেখেও, এখন তারা নতুন বাস্তবতায় নিজেদের ‘বিশ্বস্ত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
দ্বিতীয়ত, এদের মধ্যে একটি ‘নব্য রাজনৈতিক আর্যগোষ্ঠী’ ভাব তৈরি হয়েছে—যেখানে নিজেদেরকে ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এখানে রাজনীতি আর জনসেবার বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠছে এক ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যম।
তৃতীয়ত, নেতাদের সন্তান-পরিবার, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন এবং একশ্রেণির ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এই দখল প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তারা প্রশাসনিক দপ্তর, সরকারি প্রকল্প, ব্যবসায়িক সুযোগ—সবখানেই নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইছে। ফলে একটি “সম্মিলিত আগ্রাসন” তৈরি হচ্ছে, যা মূলধারার রাজনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এখানে প্রশ্ন আসে—এই দখল সংস্কৃতি কেন বিপজ্জনক?
প্রথমত, এটি রাজনৈতিক নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যারা ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছেন, তাদের অবমূল্যায়ন হলে সংগঠনের ভেতরে হতাশা তৈরি হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে দলের ভেতরের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
দ্বিতীয়ত, এটি প্রশাসনিক কাঠামোকে অকার্যকর করে তোলে। যখন যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য বা সুযোগসন্ধানী অবস্থান প্রাধান্য পায়, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান নেমে যায়। এর প্রভাব পড়ে সেবা প্রদান, নীতি বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর।
তৃতীয়ত, এটি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ খুব সূক্ষ্মভাবে এসব পরিবর্তন লক্ষ্য করে। যখন তারা দেখে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদল নতুন মুখ শুধু দখল নিচ্ছে—তখন তারা এটিকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। বরং তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেয় যে, ‘সবই আগের মতোই চলছে, শুধু মুখ বদলেছে।’
বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ এই সরকার এসেছে লাখ লাখ নেতা-কর্মীর ত্যাগ, সংগ্রাম এবং প্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়ে। যদি এই ত্যাগের মূল্যায়ন না হয় এবং তার পরিবর্তে গুটিকয়েক সুবিধাবাদী গোষ্ঠী রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করে ফেলে, তাহলে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সুশাসন নিশ্চিত করা শুধু নীতি প্রণয়নের বিষয় নয়; এটি বাস্তবায়নের বিষয়। আর বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো—অসঙ্গতি চিহ্নিত করা এবং তা দ্রুত প্রতিরোধ করা। দখল সংস্কৃতির এই অসহিষ্ণু আচরণ যদি সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
এখানে সরকারের করণীয় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট
প্রথমত, যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মীদের দীর্ঘদিনের ত্যাগকে মূল্যায়ন করা না হলে সংগঠনের ভেতরে ভারসাম্য নষ্ট হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন রাজনৈতিক প্রভাবের দখলদারিত্বের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর অযৌক্তিক প্রভাব কমাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। এখানে আপসের সুযোগ নেই, কারণ এটি সরাসরি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত।
চতুর্থত, জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে পারলে, তারা এই ধরনের দখল প্রবণতার বিরুদ্ধে সচেতন ভূমিকা রাখতে পারবে।
শেষ কথা হলো—রাজনৈতিক পালাবদল তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, সংস্কৃতির পরিবর্তনও আনে। দখল সংস্কৃতি সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এটি যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে একটি ইতিবাচক, অংশগ্রহণমূলক এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
আজকের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই, নাকি দখলদারিত্বের পুনরাবৃত্তি? এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]













































