
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযম দুর্বলতা বা নিষ্ক্রিয়তার লক্ষণ নয়; বরং এটি তাদের সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে তেহরান-ঘনিষ্ঠ সব গোষ্ঠীই ইরানের পক্ষে সক্রিয় হয়ে উঠবে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুথিরা এখন পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় এই সংঘাতে জড়ায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযম দুর্বলতা বা নিষ্ক্রিয়তার লক্ষণ নয়; বরং এটি তাদের সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
প্রক্সি নয়, স্বতন্ত্র পরিচয়
হুথি আন্দোলন (আনসারুল্লাহ) প্রায়ই ইরানের “প্রক্সি” বা প্রতিনিধি শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু অনেক গবেষকের মতে, এই ব্যাখ্যা পুরো বাস্তবতাকে তুলে ধরে না। ইরান সময়ের সঙ্গে তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিলেও হুথিরা সরাসরি ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো সামরিক বাহিনী নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতা বজায় রাখে।
ঐতিহাসিকভাবে হুথি আন্দোলনের সূচনা ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে স্থানীয় অসন্তোষ থেকে। তখনো ইরানের তেমন কোনো বড় ধরনের সমর্থন ছিল না। তাছাড়া তাদের মতাদর্শ মূলত জায়দি শিয়া ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে, যা লেবানন বা ইরাকের অনেক গোষ্ঠীর থেকে ভিন্ন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রগতি রক্ষা
হুথিদের সতর্ক অবস্থানের অন্যতম কারণ হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাদের চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগ, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে। দীর্ঘ বছর ধরে চলা ইয়েমেনের ভয়াবহ যুদ্ধের পর ওমানের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা আলোচনায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে।
এই আলোচনার মাধ্যমে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দেওয়া এবং জাতীয় শাসন ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে এই নাজুক কূটনৈতিক অগ্রগতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং রিয়াদ ও তার মিত্রদের আবারও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে।
অতীতের সামরিক হামলার অভিজ্ঞতা
হুথিদের সংযমের আরেকটি বড় কারণ হলো অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার অভিজ্ঞতা। গাজা যুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে হুথি অবস্থান ও অবকাঠামোর ওপর একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়। এতে তাদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শক্তিশালী বিমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে হুথিরা খুবই সচেতন। ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে নামলে আবারও বড় ধরনের বিধ্বংসী হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ধরে রাখা ও শাসন পরিচালনার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাপ
ইয়েমেন বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। বহু বছরের যুদ্ধের কারণে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। বন্দর থেকে আয় কমে যাওয়া, বাজেট সংকট এবং ব্যাপক সামাজিক দুর্ভোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অনেক সরকারি কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছেন না এবং মৌলিক সেবাগুলোও ভেঙে পড়ার মুখে। এমন অবস্থায় বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও তীব্র হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
কৌশলগত ধৈর্য
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা হয়তো সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছে। তাদের নেতৃত্ব মাঝে মাঝে বলেছে যে তারা প্রস্তুত এবং “ট্রিগারে আঙুল রয়েছে”, কিন্তু এখনো সরাসরি যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেয়নি।
এই “কৌশলগত ধৈর্য” হয়তো তাদের সামরিক শক্তি সংরক্ষণ করে রাখার একটি পরিকল্পনা, যাতে ভবিষ্যতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমঝোতা বা আঞ্চলিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা যায়।
বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে জোট ও কৌশলগত সমীকরণও পরিবর্তিত হচ্ছে। লেবানন ও ইরাকের ইরান-ঘনিষ্ঠ অনেক গোষ্ঠীও এখন পর্যন্ত তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছে। তারা একদিকে আদর্শগত সমর্থন দেখালেও অন্যদিকে নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির হিসাবও করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের বর্তমান সংযত অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি দেখায় যে স্থানীয় স্বার্থ, কূটনৈতিক হিসাব এবং আত্মরক্ষার কৌশল কীভাবে ইয়েমেনের ভূমিকা নির্ধারণ করছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে হুথিদের হিসাবও বদলাতে পারে। তবে যে পথই তারা বেছে নিক, তা মূলত ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও স্বার্থের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে—শুধু ইরানের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।
ফেয়ার অবজারভার থেকে অনূদিত
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প












































