শুক্রবার । এপ্রিল ৩, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-ফিফটিন ই স্ট্রাইক ঈগল কেন আলাদা


F 15 E

যদি সত্যিই বিমানটি ধ্বংস হয়ে থাকে, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক নয়, প্রতীকী দিক থেকেও বড় ঘটনা হতে পারে

ইরানের আকাশসীমায় একটি এফ-ফিফটিন ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও বহুমুখী মার্কিন যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিচিত এই বিমানটি লক্ষ্যের গভীর আঘাত হানার সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি সত্যিই বিমানটি ধ্বংস হয়ে থাকে, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক নয়, প্রতীকী দিক থেকেও বড় ঘটনা হতে পারে। কারণ এফ-ফিফটিন ই স্ট্রাইক ঈগল দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বিমান বাহিনীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আক্রমণাত্মক প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি।

বহুমুখী যুদ্ধবিমান
ম্যাকডোনেল ডগলাস (বর্তমানে বোয়িং) নির্মিত এফ-ফিফটিন ই স্ট্রাইক ঈগল মূলত কিংবদন্তি এফ-ফিফটিন ঈগল যুদ্ধবিমানের উন্নত সংস্করণ। তবে আগের সংস্করণগুলো যেখানে প্রধানত আকাশযুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে এফ-ফিফটিন ই শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালানোর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।

এই বিমানটি একসঙ্গে দুই ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে—একদিকে শত্রুর স্থল লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা চালানো, অন্যদিকে আকাশে শত্রু যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করা। এই দ্বৈত সক্ষমতার কারণেই স্ট্রাইক ঈগলকে মার্কিন বিমান বাহিনীর সবচেয়ে কার্যকর যুদ্ধবিমানগুলোর একটি ধরা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিমান শত্রুর কঠোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করতে করতেই নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে সক্ষম।

F 15 E 2

এফ-ফিফটিন ই-এর ককপিটে থাকে দুইজন ক্রু সদস্য

রাতেও নিম্ন উচ্চতায় অভিযান
এফ-ফিফটিন ই-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো আবহাওয়া বা সময়—দিন কিংবা রাত—নিম্ন উচ্চতায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা। এই কাজে ব্যবহৃত হয় উন্নত LANTIRN (Low Altitude Navigation and Targeting Infrared for Night) ব্যবস্থা।

এই প্রযুক্তির সাহায্যে বিমানটি রাতে ভূমির খুব কাছ দিয়ে উড়ে শত্রুর রাডার এড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে এর টার্গেটিং পড অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্য শনাক্ত করতে সক্ষম, ফলে লেজার-নিয়ন্ত্রিত বা জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত বোমা দিয়ে নির্ভুল হামলা চালানো সম্ভব হয়।

দুই সদস্যের ককপিট
এফ-ফিফটিন ই-এর ককপিটে থাকে দুইজন ক্রু সদস্য। সামনের আসনে থাকেন পাইলট, যিনি বিমান চালনা ও তাৎক্ষণিক আকাশযুদ্ধ পরিচালনা করেন। পেছনের আসনে থাকেন Weapon Systems Officer (WSO), যাকে অনেক সময় “উইজ্জো” বলা হয়।

এই কর্মকর্তা রাডার, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। জটিল আক্রমণ অভিযানে এই দায়িত্ব ভাগাভাগি ব্যবস্থা বিমানটির কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাযুক্ত অঞ্চলে অভিযান চালানোর সময়।

বিশাল অস্ত্র বহনের সক্ষমতা
এফ-ফিফটিন ই-কে প্রায়ই আকাশে উড়ন্ত বোমা ট্রাক বলা হয়। কারণ এটি প্রায় ২৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অস্ত্র বহন করতে পারে। বিমানটির শক্তিশালী কাঠামো এবং একাধিক অস্ত্র বহনের পয়েন্টের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব ধরনের স্থল আক্রমণ অস্ত্র এতে বহন করা সম্ভব।

এর মধ্যে রয়েছে বাঙ্কার ধ্বংসকারী বোমা, নির্ভুল JDAM বোমা এবং দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল। একই সঙ্গে এটি AIM-9X Sidewinder ও AIM-120 AMRAAM আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে, যা শত্রু যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে।

দূরপাল্লার গতি
এফ-ফিফটিন ই অত্যন্ত দ্রুতগতির বিমান। এটি ঘণ্টায় প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটারের কাছাকাছি গতিতে উড়তে পারে।

এই বিমানটির আরেকটি বড় শক্তি হলো এর দীর্ঘ পরিসরের অভিযান সক্ষমতা। বিশেষ ধরনের কনফর্মাল ফুয়েল ট্যাংক ব্যবহারের মাধ্যমে এটি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে এবং অনেক সময় আকাশে জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

f 15 E 3

এফ-ফিফটিন ই অত্যন্ত দ্রুতগতির বিমান

আধুনিক রাডার ও প্রযুক্তি
এফ-ফিফটিন ই-এর শক্তির মূল কেন্দ্র হলো এর উন্নত অ্যাভিওনিক্স ও রাডার ব্যবস্থা। এতে ব্যবহৃত APG-70 এবং নতুন সংস্করণে APG-82 AESA রাডার অত্যন্ত শক্তিশালী ও উন্নত প্রযুক্তির।

এই রাডার একদিকে ভূমির বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করতে পারে এবং চলমান স্থল লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম, অন্যদিকে একই সঙ্গে দূর থেকে শত্রু যুদ্ধবিমানও শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে।

এর ফলে বিমানটির ক্রুরা শত্রুর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত করে তা ধ্বংস করতে পারে, অনেক সময় শত্রু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক করার আগেই।

শক্তিশালী সামরিক সম্পদ
সব মিলিয়ে এফ-ফিফটিন ই স্ট্রাইক ঈগল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণাত্মক যুদ্ধবিমান। উচ্চ গতি, বিশাল অস্ত্র বহন ক্ষমতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং বহুমুখী যুদ্ধ সক্ষমতার কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক অভিযানের মূল ভরসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ইরানে এই ধরনের একটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে তাই নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

বিদেশি পত্রিকা থেকে

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প