শনিবার । এপ্রিল ৪, ২০২৬
মাহবুব কিংশুক আন্তর্জাতিক ৩ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

উপসাগরের যেসব দ্বীপ ইরানের কৌশলগত শক্তির নীরব ঘাঁটি


Kharg-Island

তেল রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপ

পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রায় চারশো দ্বীপ ছড়িয়ে আছে। এর বেশিরভাগই ছোট, অনেকগুলো জনবসতিহীন। তবে কয়েকটি দ্বীপ এমন আছে, যেগুলো শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই নয়, বরং সামরিক, জ্বালানি, বাণিজ্য ও পর্যটনের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর আশপাশের দ্বীপগুলো ইরানের কৌশলগত শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং সেখান থেকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইরান এই প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরের দ্বীপগুলো ইরানের অসমমিতিক সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হয়ে উঠেছে।

তেল রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপ
পারস্য উপসাগরের উত্তরে, ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপকে দেশটির তেল অবকাঠামোর প্রাণকেন্দ্র বলা হয়। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এখান থেকে পরিচালিত হয়। দেশের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে এই দ্বীপে সংরক্ষণ করা হয়, তারপর সেগুলো ট্যাংকারে তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।

Kharg-Island

দ্বীপটির সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় তিন কোটি ব্যারেল

দ্বীপটির সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় তিন কোটি ব্যারেল। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী সেখানে প্রায় এক কোটি আশি লাখ ব্যারেল তেল মজুদ ছিল। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে দ্বীপটি অনেক সময় ‌‘ফরবিডেন আইল্যান্ড’ নামেও পরিচিত। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা যায় না।

খারগ দ্বীপে প্রায় আট হাজার মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই তেল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তবে দ্বীপটির ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। এখানে খ্রিস্টান মঠের ধ্বংসাবশেষ, সাসানীয় যুগের সমাধি এবং দুই হাজার তিনশ বছরেরও বেশি পুরোনো আচেমেনীয় যুগের শিলালিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকের বিমান বাহিনী বারবার এই দ্বীপে বোমা হামলা চালিয়েছিল। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এখানে বহু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বীপটি দখলের হুমকিও দিয়েছেন।

Iran Island

বৃহত্তম দ্বীপ কেশম
পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কেশম। প্রায় ১,৪০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ হরমুজ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত এবং বন্দর আব্বাস শহরের কাছেই হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত। এখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বসবাস করে, যাদের অধিকাংশ সুন্নি মুসলিম এবং তারা বান্দারি উপভাষায় কথা বলেন।

ইতিহাসে কেশম দ্বীপ বহু শাসক ও সাম্রাজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশ উভয় শক্তিই একসময় এখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। বর্তমানে দ্বীপটি পর্যটনের জন্যও জনপ্রিয়, পাশাপাশি এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

ইসলামী বিপ্লবের পর কেশমকে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি এটিকে ইরানের নৌ সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও শক্তিশালী করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এখানে একটি গোপন ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ তৈরি করেছে, যেখানে সাবমেরিন, আক্রমণাত্মক নৌযান এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

Qeshm

বৃহত্তম দ্বীপ কেশম

রঙিন প্রকৃতির হরমুজ দ্বীপ
হরমুজ প্রণালীর নামের উৎস যে রাজ্য, সেই হরমুজ রাজ্যের রাজধানী ছিল হরমুজ দ্বীপ। একাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে এই রাজ্য পারস্য উপসাগরের শক্তিশালী সামুদ্রিক শক্তি ছিল এবং উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

পরবর্তী সময়ে দ্বীপটি পর্তুগিজদের দখলে যায় এবং পরে পারস্য ও ব্রিটিশদের যৌথ নিয়ন্ত্রণে আসে। বর্তমানে দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এর বৈচিত্র্যময় ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে একে প্রায়ই ‘রেইনবো আইল্যান্ড’ বলা হয়। লাল বালির সৈকত, রঙিন পাহাড় এবং বিভিন্ন রঙের খনিজ পদার্থ এই দ্বীপকে অনন্য করে তুলেছে।

প্রণালী নিয়ন্ত্রণে লারাক
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে লারাক দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেশম দ্বীপের পূর্বে এবং হরমুজ দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপে ইরান বাংকার, আক্রমণাত্মক নৌযান এবং নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্লেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, অনেক জাহাজ এখন লারাকের উত্তর দিক দিয়ে চলাচল করছে, যেখানে ইরান একটি তথাকথিত ‘নিরাপদ করিডর’ তৈরি করেছে। এই করিডর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছে তেহরান। এমনকি একটি জাহাজ এই পথে চলাচলের জন্য প্রায় ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে বলেও একটি সামুদ্রিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিরোধপূর্ণ দ্বীপ আবু মুসা ও টুনব
পারস্য উপসাগরের তিনটি দ্বীপ—আবু মুসা, গ্রেটার টুনব এবং লেসার টুনব—নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। বর্তমানে এই তিনটি দ্বীপই ইরানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আমিরাত এগুলো নিজেদের বলে দাবি করে।

আবু মুসা তুলনামূলকভাবে বড় এবং সেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশরা উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার সময় ইরান দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকেই দ্বীপটি নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।

গ্রেটার ও লেসার টুনব দুটি ছোট দ্বীপ। ১৯৭১ সালে ইরানি বাহিনী গ্রেটার টুনবে অবতরণ করলে সংঘর্ষে কয়েকজন ইরানি ও আমিরাতি নিহত হন। বর্তমানে ধারণা করা হয়, এই দ্বীপগুলোতে ইরান মিসাইল, ড্রোন এবং নৌ মাইন স্থাপনের সক্ষমতা তৈরি করেছে।

নারী জেলেদের দ্বীপ হেঙ্গাম
কেশম দ্বীপের কাছেই ছোট্ট দ্বীপ হেঙ্গাম। মাত্র কয়েকশ পরিবার নিয়ে তিনটি গ্রামে এখানে মানুষের বসবাস। ঐতিহাসিকভাবে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশ উভয় শক্তিই এই দ্বীপকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

তবে দ্বীপটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার নারী জেলেদের সম্প্রদায়ের জন্য। এখানে বহু পরিবারে নারীরাই মাছ ধরে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এমন দৃশ্য খুবই বিরল বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

Kish

ইরানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ কিশ

পর্যটনের কেন্দ্র কিশ
ইরানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ কিশ। এর সৈকত, রিসোর্ট হোটেল এবং আধুনিক শপিং সেন্টার প্রতি বছর লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। কেশমের মতো এটিও একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল।

বিশেষত্ব হলো, কিশ দ্বীপই ইরানের একমাত্র জায়গা যেখানে বিদেশিরা ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। তবে দ্বীপটি এক রহস্যময় ঘটনার জন্যও পরিচিত। ২০০৭ সালে এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এফবিআই এজেন্ট রবার্ট লেভিনসন নিখোঁজ হন। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, তিনি ইরানের হেফাজতেই মারা গেছেন।

উপসাগরে ইরানের দ্বীপ শক্তি
সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরের এই দ্বীপগুলো শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এগুলো ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক প্রতিরক্ষা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং পর্যটন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দ্বীপগুলোর গুরুত্বও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প