বুধবার । এপ্রিল ৮, ২০২৬
মো. মিজানুর রহমান মতামত ৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬

জ্ঞান, নিরাপত্তা ও আস্থা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের পরবর্তী অগ্রযাত্রা


World health day

স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ

‌‘স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান যেমন অগ্রগতির পথ খুলেছে, তেমনি তা সবার জন্য নিরাপদ ও সমানভাবে নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এ বাংলাদেশ যখন অংশ নিচ্ছে, তখন এই বার্তা আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ আহ্বানও বটে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এসেছে। তবে আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন শুধু সেবা পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়- প্রতিটি সেবা হতে হবে নিরাপদ, মানসম্পন্ন এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। বিজ্ঞান ইতোমধ্যে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই অগ্রগতি কি সত্যিই সবার জীবনকে সমানভাবে সুরক্ষিত করছে?

দ্রুত বিস্তার, কিন্তু চাপও বাড়ছে: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৭০০-এর বেশি সরকারি হাসপাতাল এবং ৫,০০০-এর বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। সরকারি খাতে প্রায় ৫৪,০০০ এবং বেসরকারি খাতে ৯১,০০০-এর বেশি শয্যা রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও বেড়েছে- ১ লক্ষ ১১ হাজারের বেশি নিবন্ধিত চিকিৎসক এবং প্রায় ৪৮ হাজার নার্স এখন কর্মরত। এগুলো নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এর মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনও অনেক কম- প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য মাত্র প্রায় ১.৫৫ জন চিকিৎসক। ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসকদের ওপর চাপ অনেক বেশি পড়ে। এই চাপ শুধু একটি সংখ্যার বিষয় নয়, এটি সরাসরি রোগীর নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু সবার জন্য নয়: বাংলাদেশ দেখিয়েছে যে বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হতে পারে। টিকাদান কর্মসূচি এখন প্রায় সব শিশুকে কভার করছে। রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে, যার ফলে কোভিড-১৯-এর মতো প্রাদুর্ভাবে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যভিত্তিক হচ্ছে। এসবই বড় সাফল্য। তবে বাস্তবতা হলো- সব মানুষ সমানভাবে এই সুবিধা পাচ্ছে না। শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র- সব জায়গায় স্বাস্থ্যসেবার মান ও নিরাপত্তা এক নয়। এই বৈষম্য দূর করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিরাপত্তা সেবার মূল ভিত্তি: স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগীর নিরাপত্তা নির্ভর করে কিছু মৌলিক বিষয়ের ওপর- প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ, সময়মতো রেফারাল এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহার। এই বিষয়গুলো ঠিকমতো না থাকলে, সাধারণ রোগও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। ভুল চিকিৎসা, দেরিতে সেবা পাওয়া বা সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে অনেক সময় পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। তাই নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়, এটাই স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি।

তথ্যকে কাজে লাগানোর সময় এখন: বাংলাদেশ ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলায় অনেক এগিয়েছে। এখন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না। এই তথ্যকে কাজে লাগাতে হবে- কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কোথায় সেবা দুর্বল, কোথায় দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন- এসব নির্ধারণে তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে তথ্যই হতে পারে জীবন রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাণ- মানুষ: স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ। নার্স, ধাত্রী এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় তারা স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তারা পর্যাপ্ত সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা পান না। নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে এই কর্মীদের প্রশিক্ষণ, সহায়তা এবং কর্মপরিবেশ উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি।

শেষ প্রান্তে পৌঁছানোই আসল পরীক্ষা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর ওপর। একজন গ্রামের মা কি নিরাপদ প্রসব সেবা পাচ্ছেন? একজন অসুস্থ শিশু কি সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছে? মানুষ কি বিশ্বাস করতে পারছে যে তারা যে সেবা পাচ্ছে তা নিরাপদ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের সাফল্য। বিজ্ঞানকে শহরেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, এটি পৌঁছাতে হবে প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি পরিবারে।

সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন: নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা- সরকারি ও বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, পেশাজীবী এবং জনগণের অংশগ্রহণ। যখন মানুষ নিজেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়।

আগামী দিনের পথচলা: বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব। এখন সময় এসেছে সেই সাফল্যকে আরও টেকসই, নিরাপদ এবং সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করার। এর জন্য তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি-
• সেবার পরিমাণ নয়, গুণগত মান নিশ্চিত করা
• দক্ষ ও সহায়তাপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তোলা
• তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা
শেষ পর্যন্ত, স্বাস্থ্যসেবা শুধু প্রযুক্তি বা অবকাঠামোর বিষয় নয়, এটি আস্থার বিষয়। আর সেই আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন সেবা হয় নিরাপদ। কারণ নিরাপত্তাই পারে সেই আস্থাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং বাঁচাতে অসংখ্য প্রাণ।

মো. মিজানুর রহমান: লিড- স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ওয়াশ কর্মসূচি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।